পাচ সিটিসহ জাতীয় নির্বাচনের বছর শুরু

বিশেষ প্রতিনিধি: শুরু হলো নতুন বছর। ২০১৮ সালটি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ বছর। এ বছরের শেষে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর আগে অন্তত পাচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচন হবে। অর্থাৎ বছরজুড়েই আলোচনা-সমালোচনার ‘মধ্যমণি’ থাকবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন নিয়ে এখন থেকেই আগ্রহ, কৌতূহল এবং প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

নির্বাচনের এই বছরে রাজনীতির মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও রাজপথের বিরোধী দল বলে পরিচিত বিএনপির জন্য হবে ‘অনেক হিসাব মেলানোর’ বছর। সরকারি দলের চ্যালেঞ্জ হবে তাদের অধীনে নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ও বিতর্কিত নির্বাচন না করা, বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনকে সংগঠিত হতে না দেওয়া।

আর বিএনপিকে সংসদ ভেঙে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান ক্ষমতাসীনদের বাধ্য করতে হবে। বিএনপির জন্য কাজটা অনেক কঠিন। কেননা, এই দাবিতে আন্দোলন করে ব্যর্থ হয়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকে দলটি। দলটি চাইছে চলতি বছরের জুলাই-আগস্টে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলনে নামার। অবশ্য সেই আন্দোলনে যাওয়ার আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো কেমন হবে, সেই নির্বাচনে বিএনপিদলীয় প্রার্থীদের অবস্থান কেমন হবে, এ বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে।

বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে বলেছে তারা নির্বাচনে অংশ নেবে, তবে নির্বাচন হতে হবে অবাধ ও নিরপেক্ষ। বিএনপি একাই এ মত পোষণ করে এমন নয়, তাদের সহযোগী অন্যান্য দলেরও অভিমত একই।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপির এই দাবিকে গ্রহণ করবে না বলে স্পষ্ট বলে দিয়েছে। দাবি তো মানবেই না এমনকি এসব বিষয় নিয়ে তারা বিএনপির সাথে কোনো আলোচনা করতেও রাজি নয়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দিয়ে বলেছেন, নির্বাচন পরিচালনা তো সরকার করে না, নির্বাচন কমিশন করে। তাদের অধীনেই নির্বাচন হবে। সে ক্ষেত্রে তারা কেন সরকার থেকে সরে দাঁড়াবে। নির্বাচন সহায়ক সরকার প্রশ্নে দেশের প্রধান দুই দলের অবস্থান উত্তর ও দক্ষিণে। তাদের এক মেরুতে আসতে সংলাপে যোগ দিতেও ক্ষমতাসীনেরা নারাজ। নির্বাচন সহায়ক সরকার প্রশ্নে আওয়ামী লীগের অবস্থান সম্পর্কে বলা হচ্ছে যে এ ক্ষেত্রে তারা সংবিধানের বাইরে যাবে না। সব মিলিয়ে আগামী বছর জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে উত্তপ্ত থাকবে রাজনৈতিক অঙ্গন।

জাতীয় নির্বাচন বাদেও নতুন বছরের শুরু থেকেই দেশে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করবে। ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হকের অকাল মৃত্যুর কারণে শূন্য হওয়া মেয়র পদে নির্বাচন হতে হবে ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ তারিখের মধ্যে। নির্বাচন কমিশন সে লক্ষ্যে প্রস্তুতি শুরু করেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরাও নড়াচড়া শুরু করেছেন। তবে কিছু আইনি জটিলতায় ঢাকা উত্তর সিটির নির্বাচন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও কেউ কেউ করছেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢাকা উত্তর সিটির নির্বাচন নিয়ে প্রধান বা বড় রাজনৈতিক দলগুলোর খুব বেশি আগ্রহ না থাকার কথাই শোনা যাচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটির নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে বলে অনেকের ধারণা। তাই এই নির্বাচনে গিয়ে ভাগ্য পরীক্ষার ঝুঁকি নিতে নাকি প্রায় সবারই অনীহা। তবে কোনো ঝামেলা যদি না হয় এবং নির্বাচন কমিশন যদি তফসিল ঘোষণা করে তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো পিছিয়ে থাকবে না।

ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনের পর বছরের মাঝামাঝি সময় আরো কয়েকটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হওয়ার কথা। রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তোড়জোড়ও শুরু হয়ে যাবে। আগের বার এই সিটি কর্পোরেশনগুলোতে আওয়ামী লীগ হেরে গিয়েছিল। তারপর জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়।

৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে কী হবে- তাও এ বছরই দেখা যাবে। তবে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বছরটি কতটা টানটান উত্তেজনায় যাবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা থাকবে কিনা ইত্যাদি বছর শেষেই দেখা যাবে, নির্ধারিতও হবে। সে কারণে ২০১৮ সালটি বাংলাদেশের জন্য অনেক বেশি প্রতীক্ষা ও প্রত্যাশার বছর হয়ে থাকছে। সবাই আশা করছে বছরটি ভালোভাবে কাটানো আর ভালো নির্বাচন শেষে একটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশ পরিচালনার নেতৃত্বকে জাতি নির্বাচিত করবে।

এদিকে নাম না প্রকাশের শর্তে নির্বাচন কমিশনের দুজন কর্মকর্তা বলেন, রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর কমিশনের আস্থা বেড়েছিল। কিন্তু এরপর ১২৭টি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেই আস্থায় কিছুটা হলেও চিড় ধরেছে। কেননা, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে একযোগে ভোট গ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণা করা হবে। এত বড় একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে সুষ্ঠুভাবে করা আর একটি–দুটি স্থানীয় সরকারের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করা এক নয়, এটা কমিশন বুঝতে পারছে। ওই দুই কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচনে প্রশাসনের নিরপেক্ষ অবস্থান খুব জরুরি।

ইসি সূত্র বলছে, বছরের শুরুতে জানুয়ারির মাঝামাঝি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা আছে। ফেব্রুয়ারির শেষে দিকে ভোট গ্রহণ হতে পারে। এরপর এপ্রিলে-মে মাসে খুলনা, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং বছরের মাঝামাঝি গাজীপুর ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা আছে। আগস্টের পর আর কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে চায় না কমিশন। মূলত আগস্ট থেকে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করার পক্ষে তারা।

সূত্র বলছে, আগামী ৩১ ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী তিন মাসের মধ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সে ক্ষেত্রে আগামী নভেম্বরে মাঝামাঝি বা শেষ দিকে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা আছে। কমিশন চলতি বছরের শেষ দিকে ভোট অনুষ্ঠানের পক্ষে। সরকারি দলও চলতি বছরের ডিসেম্বরের ভোট গ্রহণ চায়। যদিও অন্য দল এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দেয়নি।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ মনে করেন, একটি সুষ্ঠু জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কমিশন ভালোভাবেই কাজ করছে। লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে সেই অনুযায়ী সব কাজ এগোচ্ছে। তাঁর মতে, কমিশন সংবিধানের প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নির্বাচন করবে। এখানে কমিশনের ওপর কারো কোনো চাপ থাকার সুযোগ নেই, নিয়ন্ত্রণ আরোপেরও সুযোগ নেই। এক প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ বলার মতো সময় এখনো আসেনি। এটি কমিশনের একেবারেই একক সিদ্ধান্তের ব্যাপার।

মতামত দিন