ব্যাংকার্স সভায় নিজেদের সুরক্ষা চাইলেন আতঙ্কিত এমডিরা

সদ্য বিদায়ী বছরে ‘ব্যাংক দখলের’ ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এই খাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহীরা। এ বিষয়ে বুধবার (৩ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় নিজেদের সুরক্ষার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা চেয়েছেন তারা। এদিকে, আগ্রাসী ঋণের ব্যাপারে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে বৈঠকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এমডিসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী এতথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বৈঠকে ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনে ব্যাংকারদের আতঙ্কিত হওয়ার বিষয়ে গভর্নর বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতের মালিকানা পরির্বতন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কেউ শেয়ার বিক্রি করে চলে গেলে কিছু করার থাকে না। তাই ভীত হওয়ার কোনও কারণ নেই। তবে সুশাসন প্রশ্নে কোনও ছাড় দেবে না বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই অনিয়ম করে পার পাবেন না কোনও এমডি। অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়ালে তাদের অপসারণসহ শাস্তির আওতায় আসতেই হবে।’

বৈঠকের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, ‘ব্যাংকার্স বৈঠকে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ব্যাংকাররা ব্যাংকিং খাতে মালিকানা পরিবর্তন নিয়ে কথা বলেছেন। এখানে অনিময় করে কিছু হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তা দেখবে। এর বাইরে দেখার সুযোগ নেই। আর অনিময় করে কোনও প্রধান নির্বাহী পার পাবেন না বলে তাদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী ঋণের বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোর আমানত থেকে ঋণের পরিমাণ যেন নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকে, তা খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, শিগগিরই ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণসীমা হালনাগাদ করে তা কমিয়ে আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে ইসলামিক ব্যাংকগুলো তার আমানতের ৯০ শতাংশ বিনিয়োগ করতে পারে। সেটি পুনর্নির্ধারণ করে ৮৮ শতাংশ করা হতে পারে। আর কনভেনশনাল ব্যাংকগুলো আমানতের ৮৫ শতাংশ বিনিয়োগ করতে পারে। এ হার নামিয়ে ৮০-৮১ শতাংশ করা হতে পারে।’

এ প্রসঙ্গে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘গত বছরে ব্যাংকিং খাতে হঠাৎ বেশ কিছু পরিবর্তন আমরা দেখেছি। এতে আমরা উদ্বিগ্ন। আমানতকারীরাও আতঙ্কে রয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ প্রত্যাশা করি আমরা।’ তিনি বলেন, ‘সভায় সাইবার হ্যাকিং প্রতিরোধে ব্যাংকগুলোকে সর্তক থাকার জন্য বলা হয়েছে। এ নিয়ে একটি প্রজেন্টেশনও দেওয়া হয় সভায়। সাইবার হ্যাকিং প্রতিরোধ কিভাবে করতে হবে, তার একটি গাইডলাইন দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে রফতানির চেয়ে আমদানি পরিমাণ বাড়ছে কেন, রফতানির প্রবৃদ্ধি কমছে কেন, তা খতিয়ে দেখার জন্য ব্যাংকের এমডিদের বলা হয়েছে।’

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান উল্লেখ করেন, ‘কিভাবে রফতানি বাড়ানো যায়, সে বিষয়েও আলোচনার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার জন্য বলা হয়েছে। নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সর্তকতা সঙ্গে ব্যাংকিং করতে। আমানতের চেয়ে ঋণ বিতরণ বাড়ছে কেন, সে বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।’ তিনি বলেন, বৈদেশিক বাণিজ্যে বিশেষ করে ডলারের বাজারে যে অস্থিরতা চলছে, তা নিয়ন্ত্রণে ব্যাংকগুলোকে ভূমিকা রাখতে বলা হয়েছে। সভায় রেমিটেন্স বাড়াতে বিদেশে অবস্থিত ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোকে আরও সোচ্চার হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন গভর্নর। সভায় গ্রাহকদের ওপর ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।’

এই প্রসঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান প্রধান বলেন, ‘সামনের দিনগুলোতে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি মোকাবিলা বিষয়ে আলোচনাসহ সাইবার অপরাধ ও হ্যাকিং বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে আরও সর্তক থাকতে বলা হয়েছে। গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ব্যাংকগুলোকে উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, ঘোষিত মুদ্রানীতি ছাড়িয়ে সম্প্রতি ১৯ শতাংশ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে। এটি দরকার নেই। সরকারের ঘোষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ হলেও যথেষ্ট।

সূত্র জানায়, কিছু ব্যাংক তার স্বীকৃত বিল পরিশোধে গড়িমসি করে। এ সম্পর্কে বেশকিছু বিদেশি ব্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অভিযোগ করেছে। এ ব্যাপারে ব্যাংকগুলোকে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা বাজার পরিস্থিতি যেন অস্থিতিশীল না হয়, সেদিকে সর্তক থাকতে বলা হয়েছে। অস্বাভাবিক আমদানি এবং গুণগত পণ্য আমদানি হচ্ছে কিনা সেটি প্রয়োজনে যাচাই করতে বলা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় আমদানি যাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে চাপ না ফেলে সেটি মনে রাখতে হবে।

মতামত দিন