বাণিজ্য সম্ভাবনার নতুন ঠিকানা রামগড় স্থলবন্দর

বাংলাদেশের আন্তঃ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলতে যাচ্ছে রামগড় স্থলবন্দর। কারণ খাগড়াছড়ির রামগড়ে বহু প্রতীক্ষিত দেশের ২৩তম স্থলবন্দর স্থাপনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এ স্থলবন্দর স্থাপনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফেনী নদীর রামগড়-সাবরুম অংশে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু-১ এর নির্মাণ কাজ শুরুতে এ অঞ্চলের আশা জাগানিয়া মানুষগুলো অর্থনৈতিক মুক্তির প্রত্যাশা করছেন।

গত ১০ নভেম্বর ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ভূমি পূজার মাধ্যমে ফেনীর নদীর ওপর নির্মিয়মাণ বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু-১ এর নির্মাণ কাজ শুরু করায় নতুন আশায় উজ্জীবিত এসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ বিনিয়োগকারী-ব্যবসায়ীরা। বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল সংখ্যক মানবসম্পদ কাজে লাগবে সম্ভাবনার এ কর্মযজ্ঞে। ওই সময় চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যে সবার সামনেই খুলে যাবে নতুন এক স্বর্ণালী সময়।

জানা যায়, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ত্রিপুরা রাজ্যসহ মেঘালয়, আসাম, মনিপুর মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং অরুণাচল এ সাত রাজ্যের (সেভেন সিস্টার্স) সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার বহু আগেই রামগড়-সাবরুম স্থলবন্দর স্থাপনে উদ্যোগী হয়। যদিও রাজনৈতিক ও নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন থমকে ছিল। বর্তমান সরকারের আন্তরিক উদ্যোগে চলতি বছরেই বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে রামগড়-সাবরুম স্থলবন্দরের দৃশ্যমান অবকাঠামো। এ জন্য ভারত সরকার ফেনী নদীর ওপর চারলেন বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের একটি সেতু নির্মাণ করে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কাজ হাতে নিয়েছে।

রামগড় পৌরসভার মহামুনি ও সাবরুমের আনন্দপাড়া এলাকা হয়ে সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। এ জন্য ভারত সরকারের খরচ হবে ১১০ কোটি রুপি। আর নির্মাণ সময় ধরা হয়েছে দুইবছর পাঁচমাস। বাংলাদেশ ও ভারত সরকার ইতিমধ্যে স্থলবন্দরকে ঘিরে বন্দর টার্মিনাল, গুদামঘর সহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণ কাজও চূড়ান্ত করেছে।

রামগড় সড়ক বিভাগের প্রকৌশলী মুসলেহ উদ্দিন চৌধুরী ও জাইকা প্রতিনিধি সুদীপ্ত চাকমা জানান, রামগড় স্থলবন্দরের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সংযোগ সড়ক (রামগড়-বারৈয়ারহাট পর্যন্ত) উন্নয়নের কাজ বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাইকা কর্তৃক বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হওয়ায় আশা করা যায় কাঙ্ক্ষিত সময়ের মধ্যেই এটি সম্পন্ন হবে। এ সড়কটি চারলেনে রূপান্তরের কথা রয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের নাজিরহাট থেকে রামগড় স্থলবন্দর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের মহাপরিকল্পনার কথা হাটহাজারীতে গত ৬ জানুয়ারি এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। অন্যদিকে ত্রিপুরার আগরতলা থেকে সাবরুম পর্যন্ত রেললাইনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। সরেজমিন এই প্রতিবেদক গত বছর অক্টোবর মাসে সাবরুম রেলস্টেশনের নির্মিয়মাণ অবকাঠামো স্বচক্ষেই দেখে এসেছেন। এছাড়া সাবরুম-উদয়পুর-আগরতলা সড়কগুলো এ মহকুমার সঙ্গে অন্য মহকুমা ও জেলার সড়ক উন্নয়নের কাজ হাতে নিয়েছে। সড়ক পথে রামগড় চট্টগ্রাম বন্দরের দূরুত্ব ৭২ কিলোমিটার এবং সাবরুম-আগরতলা ১৩৩ কিলোমিটার।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান তপন কুমার চক্রবর্তী গত ২ জানুয়ারি খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় জানিয়েছিলেন, রামগড় স্থলবন্দর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ২৩তম। এ জন্য রামগড়ের মহামুনিতে ১০ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ প্রক্রিয়াধীন। এর আগে বাংলাদেশ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আয়োজনে ৭ ডিসেম্বর ১৬ রামগড় পৌর মিলনায়তনে দুই দেশের প্রতিনিধি দলের উপস্থিতে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা বৈঠক শেষে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলৗ বিধান চন্দ্র ধর সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ফেনী নদীর ওপর ৪১২ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৪ দশমিক আট মিটার প্রস্থ সংযোগ সেতুটির নির্মাণ ভারত সরকার করবে। তবে মূল সেতুটির দৈর্ঘ্য হবে ১৫০ মিটার। ধারণা করা হচ্ছে ২০১৯ সাল নাগাদ কাজ সম্পন্ন হবে। ভারতের জাতীয় সড়ক বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী আনন্দ কুমার ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, ৬ জুন ১৫ ঢাকা সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফেনী নদীর ওপর রামগড়- সাবরুম মৈত্রী সেতু -১ এর ভিত্তিপ্রস্তর উম্মোচন করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার হিসাবে পরিচিত ১৯২০ সালের সাবেক মহকুমা শহর খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলায় স্থলবন্দর স্থাপনের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ দেড় যুগের পর নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময় নতুন ভাবে আলোচনায় আসে।

সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য মংপ্রু চৌধুরী ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল কাদের বলেন, দীর্ঘদিন ধীরগতিতে কাজ চললেও সমপ্রতি ভারত-বাংলাদেশ উভয় পক্ষ ত্বরিত গতিতে স্থলবন্দর বাস্তবায়নের কাজ শুরু করায় ব্যবসায়ীসহ সকল মহল আশার আলো দেখছেন।

মতামত দিন