‘সাদা ইউনিফর্ম ছিল রাজনের অস্ত্র, ব্যান্ডেজ ছিল গোলাবারুদ’

আহতদের চিকিৎসা দিচ্ছেন রাজন আল নাজ্জার-হেভি ডটকম

গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের বসতবাড়িতে ফেরার বিক্ষোভে তার সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। সবাই দেখছে, ইসরাইলি স্নাইপারদের গুলিতে আহতদের সেবা দিতে সাদা ইউনিফর্ম পরা এক নারী মেডিকেলকর্মী সদা তৎপর। এতটুকু বিশ্রাম নেয়ারও তার অবকাশ নেই।

কেউ আহত হলেই তিনি তার কাছে ছুটে যাচ্ছেন। সেবা শুশ্রুষা দিয়ে তাকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করছেন। বেশি আহত হলে অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।

জরুরি চিকিৎসাসেবার একজন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, ফিলিস্তিনি সমাজে একজন নারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে তার অনেক কিছু করার আছে। তিনি তা করতে চেষ্টা করেছেন।

২১ বছর বয়সী রাজন আল নাজ্জার বলতেন, একজন চিকিৎসাকর্মী হিসেবে তিনি কেবল চাকরি করবেন, তা হতে পারে না। এর মধ্য দিয়ে নারী হিসেবে নিজের কাজটাও করতে চান।

৩০ মার্চ শুরু হওয়া বিক্ষোভের দশম শুক্রবার মাগরিবের আজান দিতে ঘণ্টাখানেক সময় বাকি ছিল। রাজন বাড়িতে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু তিনি দেখলেন এক বিক্ষোভকারী আহত হয়ে পড়ে আছেন।

তিনি দ্রুত পায়ে তার কাছে ছুটে গেলেন। তাকে চিকিৎসা দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে দেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ইসরাইলি সেনারা তখন তাকে লক্ষ্য করে দুটি কিংবা তিনটি গুলি ছোড়ে। বুকে গুলিবিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, মাস দুয়েক ধরা ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভে ইসরাইলি গুলিতে তাকে নিয়ে ১২৩ জন নিহত হয়েছেন। গত শুক্রবার বহু মানুষ আহত হলেও একমাত্র রাজনই নিহত হন।

একজন মেডিকেল কর্মী হিসেবে আল নাজ্জারকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা গেলেও ইসরাইলি সেনারা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। জেনেভা কনভেনশন অনুসারে যেটি সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ।

শনিবার জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতিতে জানিয়েছে, এটি ভয়ঙ্কর নিন্দনীয় অপরাধ।

এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তারা একটি তদন্ত শুরুর কথা জানিয়েছে।

১৯৪৮ সালে ইহুদি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় থেকে প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনি নিজেদের বসতবাড়ি থেকে বিতাড়িত হন।

এসব ফিলিস্তিনি পার্শ্ববর্তী আরব দেশ, অধিকৃত পশ্চিমতীর ও গাজায় শরণার্থী হিসেবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের নিজেদের ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার দাবিতে গত ৩০ মার্চ থেকে গ্রেট মার্চ ফর রিটার্ন আন্দোলন শুরু হয়েছে।

এ ছাড়া গত একযুগ ধরে গাজা উপত্যকাটি অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইহুদিবাদী ইসরাইল। সেখানে সীমান্ত দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীও প্রবেশ করতে দেয়া হয়।

এতে উপত্যকাটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কারাগারে রূপান্তরিত হয়েছে। সেখানকার অর্থনীতিও প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।

গত ১৪ মে তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের প্রতিবাদে ফিলিস্তিনিরা বিক্ষোভে ফেটে পড়লে ইসরাইলি স্নাইপারদের গুলিতে ৬২ জন নিহত হন।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেন।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে একজন নারী হিসেবে নাজ্জারও ঘরে বসে থাকতে পারেননি। ইব্রাহিম আল নাজ্জার নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, এক বৃদ্ধ লোকের মাথায় ইসরাইলের টিয়ারগ্যাসের আঘাত লাগলে রাজন আল নাজ্জার তার সাহায্যে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তখনই তাকে গুলি করা হয়।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজন আল নাজ্জার নিজের হাত উঁচিয়ে আহতদের উদ্ধার করতে গিয়েছিলেন। তিনি যে একজন চিকিৎসাকর্মী তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।

ইসরাইল সীমান্তে কৃষিনির্ভর গ্রাম খোঁজার বাসিন্দা ছিলেন রাজন। তার বাবা আশরাফ আল নাজ্জারের মোটরসাইকেলের যন্ত্রপাতি বিক্রির একটি দোকান ছিল।

কিন্তু ২০১৪ সালে ইসরাইলি গোলায় সেটি ধ্বংস হয়ে যায়। এর পর থেকে তিনি পুরোপুরি বেকারত্বের জীবনযাপন করছেন।

তার ছয় সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে বড় রাজন আল নাজ্জার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে দুই বছরের প্যারামেডিক প্রশিক্ষণ নেন।

রাজন দেশটির বেসরকারি সংস্থা প্যালেস্টাইন মেডিকেল রিলিফ সোসাইটির একজন স্বেচ্ছাসেবী ছিলেন।

৪৪ বছর বয়সী আশরাফ আল নাজ্জার বলেন, তার মেয়ে সেদিন রাতে সেহরি খাওয়ার পর তাহাজ্জুদ নামাজ পড়েন। এটিই ছিল তার মেয়েকে শেষ দেখা।

মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার সংবাদিক ইয়াদ আবু হাওয়াইলা ও ইসাবল কেশনার বলেন, গত মাসে খান ইউনিসে যখন তার সঙ্গে আমাদের কথা হয়, তখন রাজন বলেছেন, তিনি যা করছেন, তাতে তার বাবা গর্বিত। তাকে নিয়ে তার বাবা গর্ববোধ করেন।

নিউইয়র্ক টাইমসকে রাজন তখন বলেন, আমাদের একটিই লক্ষ্য। মানুষের জীবন বাঁচানো ও আহতদের উদ্ধার করা।

তিনি বলেন, আর বিশ্বকে এই বার্তা দিতে চাই- অস্ত্র ছাড়াই আমরা সব কিছু করতে পারি।

শুক্রবার ইসরাইলি সীমান্তবেষ্টনী থেকে তিনি ৩০০ ফুট দূরে ছিলেন রাজন। টিয়ারগ্যাসে আহত এক ব্যক্তির মাথায় ব্যান্ডেজ করে দেয়ার পর তাকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেন।

এ সময়ে রাজন নিজেও টিয়ারগ্যাসে আক্রান্ত হন। অন্য প্যারামেডিকরা তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তখনই ইসরাইলি গুলি তার বুকে বিদ্ধ হলে তিনি লুটিয়ে পড়েন।

ইব্রাহিম আল নাজ্জার বলেন, রাজন কাউকে গুলি করেননি। সে মানুষের প্রাণ রক্ষায় এগিয়ে গিয়েছিলেন। আহতদের চিকিৎসা দিচ্ছিলেন।

ডা. সালাহ আল রানটিসি বলেন, মারাত্মক আহতাবস্থায় খান ইউনিসের ইউরোপিয়ান হাসপাতালে তাকে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে অপারেশন থিয়েটারে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে রাজনের রক্তমাখা ইউফর্মটি হাতে নিয়ে তার মা বলেন, এটি আমার মেয়ের অস্ত্র, যা দিয়ে সে ইহুদিবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করত।

আর তার মেডিকেল জ্যাকেটের ভেতরে পাওয়া দুটি ব্যান্ডেজ দেখিয়ে তার মা বলেন, এগুলো ছিল তার গোলাবারুদ।

খান ইউনিসের প্রতিবাদ শিবিরে রাজনই ছিলেন একমাত্র নারী চিকিৎসাকর্মী। একজন নারী কী করতে পারেন, তা তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন।

রাজনের মা বলেন, আমাদের সমাজে নারীদের প্রায়ই বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু সমাজ আমাদের গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

তিনি বলেন, তারা যদি পছন্দমতো আমাদের গ্রহণ না করে, পরে জোর করে গ্রহণ করাতে বাধ্য করা হয়। কারণ যে কোনো পুরুষের চেয়ে আমাদের শক্তি কোথাও কম না।

শোকাহত এ ফিলিস্তিনি মা বলেন, বিক্ষোভের প্রথম দিনেই আমরা যা শক্তি দেখিয়েছে, তা আপনারা আর কোথাও পাবেন না।

কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে যাওয়া রাজনের মা সাবরিন আল নাজ্জার তার মেয়েকে সর্বশেষ দেখার কথা স্মরণ করে বলেন, সে আমার সামনে এসে হাসি দিয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাকে বলল, আমি বিক্ষোভের দিকে যাচ্ছি। চোখের পলকেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আমিও তাকে দেখতে বারান্দায় চলে যাই। কিন্তু এতখনে সে রাস্তার শেষ মাথায় চলে গেছে।

তিনি বলেন, সে যেন পাখির মতো আমার কাছ থেকে উড়ে চলে গেছে।

মতামত দিন