আজ ছাতনী গণহত্যা দিবস

মোঃ হাসিবুল হাসান,নাটোর জেলা প্রতিনিধি:
আজ ৪ জুন নাটোরের ছাতনী গণহত্যা দিবস। একাত্তর সালের এদিন গভীর রাতে হানাদার বাহিনীসহ কয়েকশ বিহারী ছাতনী গ্রামসহ আশপাশের ১০/১২ টি গ্রামে ঢুকে ঘুমন্ত মানুষদের ধরে পিঠ মোড়া করে বেঁধে ছাতনী স্লুইচ গেটে এনে জড়ো করে।

পরদিন সকালে প্রথমে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে এবং গলাকেটে হত্যা করে। তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করতে মুখে এসিড দিয়ে ঝলসানো হয়। পরে এসব শহীদদের লাশ ছাতনী স্লুইচ গেটসহ আশে পাশের পুকুর ও ডোবায় মাটি চাপা দেয়া হয়।

১৯৭১ সালে নাটোরের ছাতনী গ্রামের গণহত্যার সেই নৃশংস ও হৃদয় বিদারক কথা আজো এ এলাকার মানুষের মনে নাড়া দেয়। ১৯৭১ সালের ৪ জুন এই দিনে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে শহীদ হন প্রায় পাঁচ শতাধিক ‌নিরীহ বাঙালি। শহীদ‌দের র‌ক্তে লাল হ‌য়ে লাল আ‌শেপা‌শের খাল, বিল ও পুকুর।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর উত্তরাঞ্চলের হেড কোয়ার্টার ছিল নাটোরে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদর বা‌হিনী নাটোরের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা চালিয়েছে। এর মধ্যে নাটোর সদর উপজেলার ছাতনী গ্রামের গণহত্যা ছিল নৃশংস ও হৃদয়বিদারক।

নাটোর শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে ছাতনী গ্রামে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা তৎকালীন এমসিএ শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর বাড়ি হওয়ায় এই জনপদের অধিকাংশ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। এ কারণে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের আক্রোশে পড়ে এই গ্রামটি।

একাত্তরের ৪ জুন গভীর রাতে হানাদার বাহিনীসহ কয়েকশ বিহারী ছাতনী গ্রামসহ আশপাশের শিবপুর, পণ্ডিত গ্রাম, বারোঘড়িরা, ভাটপাড়া, আমহাটি, ভাবনি, হাড়িগাছা, রঘুনাথপুর ও বনবেলঘরিয়াসহ ১০/১২টি গ্রামে ঢুকে ঘুমন্ত নিরীহ মানুষদের ধ‌রে এ‌নে হত্যা করে।

দুঃখজনক হ‌লেও সত্য, যাদের এতো বড় আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে তাদের পরিবারের সদস্যদের ভাগ্যে জোটেনি আজও কোনো সরকারি সাহায্য সহযোগিতা। শহীদ পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের আজও মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি ছাতনী গণহত্যার দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়া হোক। সেই সঙ্গে দেশে শুরু হওয়া মানবতা বিরোধীদের সঙ্গে ছাতনী গণহত্যার ইন্ধন দাতাদেরও দ্রুত বিচার শুরু করা হোক।

এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে প্রতি বছর স্থানীয় লোকজন দিবসটি পালন করলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে দিনটি পালন করার কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি। সবার নাম সংগ্রহ করতে না পারায় মোট ৬৪ জনের নাম খোদাই করে রাখা হয়েছে। মহান স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও সরকারি স্বীকৃতি না পাওয়ায় আক্ষেপ করেন স্থানীয়রা।

এব্যাপা‌রে স্থানীয় বা‌সিন্দা ও মু‌ক্তিযু‌দ্ধের শহীদ স্মৃ‌তি পুরস্কার প্রাপ্ত সাংবা‌দিক মোঃ কামাল হো‌সেন ক্ষোভ প্রকাশ ক‌রে ব‌লেন, এ‌তো বড় এক‌টি হত্যাকান্ড ঘ‌টে গেল, পাঁচ শতা‌ধিক লোক শহীদ হ‌লো, সরকা‌রিভা‌বে কোন খোঁজ খবর নেওয়া হ‌লো না, এমন‌কি স্থানীয় প্রশাসনসহ জনপ্র‌তি‌নি‌ধি‌দের কো‌নো প‌রিষদ ‌দিবস‌টি পালন ক‌রে না। এ‌টি না‌টোর তো ব‌টে, জা‌তির জন্যও লজ্জাজনক।

‌তি‌নি আ‌রো ব‌লেন, ছাতনী গণহত্যায় পার্শ্ববর্তী ১০/১২ টি গ্রা‌মের এমন কো‌নো প‌রিবার নাই যারা স্বজন হারায়‌নি। এছাড়া বে‌শিরভাগ ক্ষে‌ত্রে উপার্জনক্ষম ব্য‌ক্তি‌কে হা‌রি‌য়ে স্থানীয় বা‌সিন্দারা মু‌ক্তিযু‌দ্ধের সময় যে গরীব হ‌য়ে‌ছে, তা স্বাধীনতার এতো বছর পরও কা‌টি‌য়ে উঠ‌তে পা‌রে‌নি। এই এলাকাগু‌লো এখ‌নো গরীব মানু‌ষের সংখ্যা তুলনামূলক অ‌নেক বে‌শি। তা‌দের কা‌ছে স্বাধীনতা মা‌নে শুধুই বেদনার ই‌তিহাস।

তি‌নি জানান, স্বাধীনতা যু‌দ্ধের দ‌লিলপ‌ত্রে অষ্টম খ‌ন্ডের ৮০৯/ ১০ পাতায় ইতিহা‌সের নৃশংস এই হত্যাকা‌ন্ডের বর্ণনা সংর‌ক্ষিত আ‌ছে। এছাড়া তি‌নি ছাতনী গণহত্যার শহীদ‌দের তা‌লিকা ক‌রে শহী‌দের স্বীকৃ‌তি প্রদানপূর্বক শহীদ প‌রিবারগু‌লো‌কে ক্ষ‌তিপূরণ প্রদা‌নের দ‌া‌বি জানান।

তি‌নি আ‌রো ব‌লেন, যত‌দিন ছাতনী গণহত্যার শহীদ‌দের তা‌লিকা ক‌রে শহী‌দের স্বীকৃ‌তি প্রদান করা হ‌বে না, তত‌দিন বাঙা‌লি জা‌তির ইতিহাস পূর্ণাঙ্গ হ‌বে না, কলঙ্কমুক্তও হ‌বে না, বরং এই অধ্যায়‌টি ই‌তিহা‌সের কা‌লো অধ্যায় হিসা‌বে চিহিৃত হ‌য়ে থাক‌বে।

প্রসঙ্গত, স্মৃতিস্তম্ভের শহীদের তালিকা দেয়া আছে তারা হলেন, ছাতনী গ্রামের মনির উদ্দিন সরকার, কালা মিয়া, নূরুজ্জামান, আব্দুল হান্নান, নূর মহাম্মদ, শফিউল্লাহ, আবু বকর, আব্দুল্লাহ মুন্সী, হোসেন পাটোয়ারী, আব্দুল জব্বার, কালা পাল, নিমাই চৌধুরী, শুকুমার চৌধুরী, জসিম উদ্দিন শাহ, আজাহার উদ্দিন শাহ, মনতাজ উদ্দিন শাহ, আবুল কালাম, শাহাবুদ্দিন, কালাম প্রাং, ইসমাইল, ইব্রাহিম, শুটকা, আজাহার, আব্দুর রহমান, কফিল উদ্দিন। বনবেলঘড়িয়া গ্রামের সেকেন্দার, কোরবান আলী, নরেশ ঠাকুর, কালু মিয়া, সুলতান মিয়া। গোকুলপুর গ্রামের আব্দুস সামাদ, আব্দুল কাদের। পণ্ডিতগ্রামের মনোয়ার হোসেন মনু, ডাঃ আব্দুল হামিদ, সোনা চৌকিদার, চতু মন্ডল। ভাবনী গ্রামের মেছের প্রাং, শুকবাস মন্ডল, ওসমান শেখ, এছার উদ্দিন হোসেন মন্ডল, কছির উদ্দিন মোল্লা, বাদেশ প্রাং, সুলতান পাটোয়ারী, কেয়ামত মোল্লা, রুহুল আমিন ভূঁইয়া, আছের শেখ, কেকু প্রাং, আব্দুর রহমান, কাঁচু প্রাং। ছাতনী দিয়াড় গ্রামের আয়ুব আলী মন্ডল, ছাতনী পূর্বপাড়া গ্রামের সৈয়দ আলী মুন্সী, ছাতনী শিবপুর গ্রামের পচাই দফাদার, হামিদ দফাদার, ভাটপাড়া গ্রামের ময়দান মোল্লা, শিবপুর গ্রামের সাধু প্রাং, খলিল মন্ডল, শুকুর প্রাং, হাড়িগাছা গ্রামের কালা চাঁদ, রঘুনাথপুর গ্রামের শুকলাল, বড়গাছা গ্রামের জঙ্গী, আব্দুল জব্বার, জসিম উদ্দিন ও আব্দুল কাশেম। এছাড়া আরও নাম না জানা প্রায় পাচঁ শতাধিক শহীদ রয়েছে।

মতামত দিন