বিএনপি ভারতের স্বার্থবিরোধী কাজ করেনি:বিবিসি বাংলার সাক্ষাৎকারে ফখরুল

দক্ষিণ এশিয়ার প্রভাবশালী দেশ ভারত। প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনীতিতেও একধরনের প্রভাব রয়েছে ভারতের, বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রতিবার নির্বাচন এগিয়ে এলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের ভারত সফর বেড়ে যায়। কিছুদিন আগে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দলের ভারত সফর করে আসে। বর্তমনে ভারত সফরে আছেন দেশের অপর রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সচিব হুমায়ুন কবির।

বিএনপি নেতাদের এই ভারত সফর নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন সরগরম। এই ইস্যুটি নিয়ে বর্তমানে লন্ডনে অবস্থানকারী বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবিসি বাংলাকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। এটি নিচে তুল ধরা হলো।

ভারতের সঙ্গে কী ধরণের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে বিএনপি তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে গত কয়েকদিন ধরে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদলের নয়াদিল্লি সফরের পর। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিএনপির নেতারা বাংলাদেশে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ভারতের সহায়তা চেয়েছেন। লন্ডন সফররত বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবিসির স্টুডিওতে এসেছিলেন রবিবার। তিনি বিবিসি বাংলার শাকিল আনোয়ারকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে কথা বলেন। সেই সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত:

নির্বাচনের ব্যাপারে ভারতের কাছে ঠিক কী ধরণের সাহায্য চাইছেন আপনারা?

– আমরা যেটা চাই ভারতের কাছে, বাংলাদেশে একটা সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভারত যেন সহায়তা করে। । ভারত আমাদের প্রতিবেশী, প্রভাবশালী দেশ। তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ, ঘনিষ্ঠ। তাদের যথেষ্ট যোগাযোগ আছে বাংলাদেশের সঙ্গে। সেখানে অবশ্যই ভারতের একটা ভূমিকা আছে।

কিন্তু কিভাবে ভারত সহায়তা করবে?

– যে কোন দেশ যদি বড় হয় এবং তাদের যদি একটা ইনফ্লুয়েন্স থাকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক বিষয়গুলিতে, সেক্ষেত্রে তারা অবশ্যই বলতে পারে একটা নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা তোমরা করো। আমরা কোন সাহায্য চাচ্ছি না। আমরা একটা অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন চাচ্ছি যেখানে সবাই ভোট দিতে পারে।ভারতের যদি বাংলাদেশের ওপর এরকম একটা প্রভাব থাকেও, তারা কেন সেটা করবে? বিশেষ করে যখন বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারতের এত ভালো সম্পর্ক এবং বিএনপির ব্যাপারে ভারতে অনেকের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে?

এই সন্দেহ অনেকটাই অমূলক। কারণ বাংলাদেশে বিএনপি সরকার কখনোই ভারতের স্বার্থবিরোধী কোন কাজ করেছে বলে আমার জানা নেই। আর দ্বিতীয়ত বাংলাদেশে একটা গণতান্ত্রিক সরকার, জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে এমন একটা সরকার ভারতের জন্যই খুব প্রয়োজনীয়। আর ভারতের সঙ্গে বিএনপির বৈরি সম্পর্ক যেগুলো প্রচার করা হয়, সেটা ঠিক নয়। কিন্তু বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ভারত তো এমন অভিযোগ করে যে বিএনপির আমলে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহীরা বাংলাদেশে আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছে। দশ ট্রাক অস্ত্রের চালানের মতো বিষয় ঘটেছে, যেটা ভারতের কাছে খুবই স্পর্শকাতর বিষয়।এ ঘটনা গুলো কতটা সত্যি, কতটা তৈরি করা, তা কিন্তু এখনো পরিপূর্ণভাবে আমরা জানি না।

কিন্তু ভারতের মধ্যে বিএনপির ব্যাপারে যে সন্দেহ, সেটা দূর করতে বিএনপির কোন কৌশল কি আছে?

– অবশ্যই, আমরা তো সুনির্দিষ্টভাবে বলেছি যে আমাদের পার্শ্ববর্তীদেশগুলোর সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক হবে, সে সম্পর্কে আমরা একটা পেপারও দিয়েছি। সেখানে আমরা পরিস্কারভাবে বলেছি, উই উইল হ্যাভ জিরো টলারেন্স এবাউট এনি ইনসারজেন্সী ইনসাইড বাংলাদেশ। তাদেরকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না। আমরা স্পষ্ট করে বলেছি তাদের কোন অস্তিত্ব থাকবে না। স্পেস থাকবে না। এটা আমরা যদি সরকারে যাই, এটা আমরা অবশ্যই নিশ্চিত করবো।

বাংলাদেশে বিএনপির ভাবমূর্তি একটি ভারত বিরোধী দল হিসেবে। এখন মানুষ যদি দেখে বিএনপিও ভারতের দ্বারস্থ হচ্ছে, সেটা কি বিএনপির রাজনৈতিক ভাবমূর্তির ক্ষতি করবে না?

– আপনারা এটাকে এমনভাবে দেখছেন কেন। আপনারা যেভাবে বলছেন তাতে এটা দাঁড়ায় যে এটা একটা প্রতিষ্ঠিত ইমেজ হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্নটা সেখানে নয়। বিএনপি যেটা বিশ্বাস করে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। আর বিএনপিকে বাংলাদেশের স্বার্থ দেখতে হবে। সেই স্বার্থ দেখতে গিয়ে কেউ যদি বলে যে আমরা ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলছি সেটা কিন্তু সঠিক একটা অ্যানালিসিস নয় বলে আমি মনে করি। আমি করি পারস্পরিক মর্যাদাবোধ, পারস্পরিক স্বার্থ এটা খুব জরুরী। ভারতের তো এটা দায়িত্ব যেন বাংলাদেশে তাদের বিরোধী মনোভাব বা ধারণা তৈরি না হয়। যেটা কীনা তাদের জন্যও ক্ষতিকর, আমাদের জন্যও ক্ষতিকর।

খালেদা জিয়ার জামিন না হওয়াটাকে কিভাবে দেখছেন?
– একটি তৈরি করা মিথ্যা মামলায় তাকে যেভাবে জেলে নেওয়া হয়েছে, সেটাকে ধরেও বলা যায় যে পাঁচ বছরের যেকোনো সাজার বিরুদ্ধে আপিল করার সঙ্গে সঙ্গে তার জামিন হয়ে যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক খালেদা জিয়ার বেলায় সেটা হয়নি। সরকার এখানে একটা প্রতিপক্ষ হয় চতুর্দিকে প্রভাব বিস্তার করছে। বর্তমানে বাংলাদেশ যে রাজনৈতিক সঙ্কট চলছে তার পেছনে একমাত্র কারণ হচ্ছে সরকারের সহনশীলতার অভাব।’ প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার তাদের যে চেষ্টা এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী, গণতন্ত্রের জন্যে যিনি সংগ্রাম করেছেন তাকে জেলে আটকে রেখে সেই সমস্যার সমাধান হবে না। খালেদা জিয়াকে জেল থেকে বের হতে না দিলে এই সমস্যা আরো বাড়বে বলে তিনি মনে করেন। খালেদা জিয়া জেলে থাকুন আর জেলের বাইরে থাকুন, তিনিই বিএনপির নেত্রী। তিনি যেখানেই থাকুন না কেন এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেবেন।

দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে জেলখানায় রেখে বিএনপি আগামী নির্বাচনে যাবে কি?

– এটা নির্ভর করছে সরকারের আচরণের উপর। দলের চেয়ারপাসন খালেদা জিয়ার মুক্তি আমাদের প্রথম ও প্রধান দাবি। নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনও আসেনি। আমি মনে করি, খালেদা জিয়াকে বর্তমান সরকার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ মনে করে। এবং একারণেই তাকে ‘নির্বাচন থেকে, রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে’ রাখার প্রচেষ্টা সবসময়ই নেওয়া হচ্ছে। তবে তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলেও এই একই চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু জনগণের চাপে তারা তখন সফল হতে পারেনি। আজকে আবার দুঃখজনক-ভাবে সেদিন যারা ‘মায়নাস টু’ তত্ত্বের শিকার হয়েছিল তারাই আবার চেষ্টা করছে ‘মায়নাস ওয়ান’ অর্থাৎ খালেদা জিয়াকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য।

দেশে যদি নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়, জনগণের ভোট দেওয়ার অবস্থা তৈরি হয়, রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রচার প্রচারণা চালাতে দেওয়া হয় তখন বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। তবে নির্বাচনকালীন সরকারকে নিরপেক্ষ হতে হবে। বর্তমান পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে হবে। সরকারকে সেনা মোতায়েন করতে হবে। এবং সকল দলকে সমান সুযোগ দিতে হবে। এসব তো শুধু আমাদের কথা নয়। সবাই বলছে। সকল রাজনৈতিক দলের কথা। ড. কামাল হোসেন, বি চৌধুরী, আ স ম আব্দুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না যারা আমাদের সাথে জোটে নেই তারাও এই প্রস্তাবের কথা বলছেন। এবং মাঝে মাঝে তাদের লোক এরশাদ সাহেবও একথাগুলো বলছেন।

মতামত দিন