জেরুজালেম প্রস্তাবে নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: জেরুজালেম প্রসঙ্গে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত এক খসড়া প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি দেওয়ার ও ওই শহরে মার্কিন দূতাবাস স্থাপনের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে এই খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করলেও নিরাপত্তা পরিষদের বাকি ১৪ দেশ এই প্রস্তাবকে সমর্থন করে ভোট দিয়েছিল। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরা, ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি ও ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
খবরে বলা হয়, নিরাপত্তা পরিষদের খসড়া প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিল মিশর। ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, জেরুজালেমের মর্যাদা প্রসঙ্গে যেকোনও সিদ্ধান্তের ‘কোনও আইনি ভিত্তি নেই, এ সিদ্ধান্ত অকার্যর এবং একে প্রতিহত করতে হবে’। ট্রাম্পের ঘোষণার বিরোধিতা থেকে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হলেও এতে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে জেরুজালেমের অবস্থান নিয়ে সম্প্রতি যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর ‘তীব্র নিন্দা’ জানানো হয় এতে।
এই প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, সেটাও আগে থেকেই অনুমান করা হচ্ছিল। নিরাপত্তা পরিষদে ভোটগ্রহণ শেষে জাতিসংঘে মার্কিন স্থায়ী প্রতিনিধি নিক্কি হ্যালের বক্তব্যেও এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, যুক্তরাষ্ট্র এই খসড়া প্রস্তাব উত্থাপনকেও ভালো চোখে দেখছে না। হ্যালে বলেন, ‘আজ নিরাপত্তা পরিষদে যা দেখলাম, তা স্পষ্টতই অপমান। আমরা এটা ভুলে যাবো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে জাতিসংঘ যে ভালোর চেয়ে খারাপটাই বেশি করছে, এটা তারই আরেকটি প্রমাণ। দূতাবাস স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সরল একটি ঘটনার জন্য আজ যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের ক্ষমতা দেখাতে হলো। আর এটাও প্রমাণিত হয়ে থাকলো, আমরা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছি।’ ইহুদিদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক মাতৃভূমি হিসেবে জেরুজালেম ছাড়া তাদের আর কোনও রাজধানী কখনোই ছিল না বলেও মন্তব্য করেন হ্যালে।

গত ছয় বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করলো উল্লেখ করে হ্যালে বলেন, ‘আমরা আনন্দের সঙ্গে এই ভেটো প্রয়োগ করিনি। তবে এটা করতে গিয়ে আমরা দ্বিধাতেও পরিনি। আমরা নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে এই ভেটো প্রয়োগ করেছি। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়ায় আমাদের ভূমিকার সপক্ষে ছিল এই ভেটো। এই ভূমিকার জন্য আমরা কখনই বিব্রত নই। আমাদের এই ভেটো বরং নিরাপত্তা পরিষদের বাকি দেশগুলোর জন্য বিব্রতকর।’

এদিকে, জেরুজালেম প্রসঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিলেও মার্কিন মিত্রদেশগুলোসহ পরিষদের বাকি ১৪টি দেশই এতে সমর্থন দিয়েছে। এ থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি দেওয়ার ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র আরও বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি দেওয়ার পরই এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল বিভিন্ন দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণা ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে বলেই আশঙ্কার কথা জানান বিশ্লেষকরা।

জাতিসংঘে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত রিয়াদ মনসুর বলেন, ‘আমরা সবাই যখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শান্তিপূর্ণ একটি পরিকল্পনার প্রত্যাশা করছিলাম, তখন দেশটি শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা স্ববিরোধী।’ তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে আরও বেশি অপরাধ করতে এবং আমাদের ভূমিতে তাদের দখলদারি মনোভাব অব্যাহত রাখতে উৎসাহিত করবে।’ ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের একজন মুখপাত্রও যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, এমন সিদ্ধান্ত ‘অগ্রহণযোগ্য এবং এটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। কারণ এটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অসম্মান করেছে।’

জাতিসংঘে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত ফ্র্যাংকয়েস ডেলাট্রেও যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের সমালোচনা করেছেন তিনি বলেন, ‘এই খসড়া প্রস্তাব যুগ যুগ ধরে জেরুজালেম প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক মতৈক্যের প্রতিফলনকেই নিশ্চিত করেছিল। এটা পাস না হওয়াটা দুঃখজনক।’

তবে নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করার জন্য নিক্কি হ্যালেকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এক টুইটে নেতানিয়াহু বলেন, ‘রাষ্ট্রদূত হ্যালেকে ধন্যবাদ জানাই। হানুক্কা’র (ইসরায়েলি পবিত্র ছুটির দিন) দিনে আপনি ম্যাকাবির (ইহুদি বিদ্রোহী যোদ্ধা) মতো কথা বলেছেন। আপনি সত্যের আলো জ্বালিয়ে অন্ধকার দূর করেছেন। আপনি একা হয়েও পরাজিত করেছেন অনেককে। আপনার মাধ্যমে সত্য পরাজিত করেছে মিথ্যাকে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, আপনাকে ধন্যবাদ। নিক্কি হ্যালে, আপনাকে ধন্যবাদ।’

উল্লেখ্য, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতির বিপরীতে গিয়ে গত ৬ ডিসেম্বর জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসরায়েলের মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানান তিনি। এই নিয়ে বিশ্বজুড়ে তুমুল নিন্দা ও প্রতিবাদ জারি রয়েছে। ফিলিস্তিন ও আরব দেশগুলোসহ মার্কিন অনেক মিত্র দেশও ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কোন দেশ যেন জেরুজালেমে কূটনৈতিক মিশন স্থাপন না করে, নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত খসড়া প্রস্তাবে সেই আহ্বানও জানানো হয়েছিল।

মতামত দিন