মোদির কপালে ভাঁজ, রাহুলের ঠোঁটে চিলতে হাসি

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের জন্য গোপালগঞ্জ যেমন, ভারতে গুজরাটও বিজেপি’র জন্য তেমন। শেখ হাসিনার দল যেমন তার নিজের জেলায় অপরাজেয়, গত ২২ বছরেরও বেশি সময় ধরে গুজরাটও ঠিক বিজেপি’র জন্য তাই। অথচ এবারের নির্বাচনে সেই গুজরাটই বিজেপির ঘুম কেড়ে নিয়েছিল প্রায়!
গুজরাটে এদিন (সোমবার) ভোট গণনার পর দেখা যাচ্ছে, বিজেপির জন্য শেষ রক্ষা হয়েছে শেষ পর্যন্ত। তবে তাদের আসন নেমে এসেছে ৯৯তে। নিজেদের দুর্গে ১৮২ আসনের বিধানসভায় তারা সেঞ্চুরিও হাঁকাতে পারবে না, এটা কিছুদিন আগেও প্রায় অকল্পনীয় ছিল। অথচ বিরোধী কংগ্রেস, রাজ্যের তিন তরুণ তুর্কী— হার্দিক প্যাটেল, অল্পেশ ঠাকোর আর জিগনেশ মেহভানির সাহায্যে নরেন্দ্র মোদির নিজের রাজ্যে প্রায় এক বিরাট অঘটন ঘটিয়েই ফেলেছিল বলা চলে।
অথচ গুজরাট দখলে রাখার জন্য নরেন্দ্র মোদি গত কয়েকমাসে কী না করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নিজের রাজ্যে যাওয়া প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এ বছর তিনি অসংখ্যবার গুজরাটে ছুটে গিয়েছেন, প্রতিশ্রুতি আর অর্থ বরাদ্দের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন। শেষ বেলার নির্বাচনি প্রচারণায় পাকিস্তানি ষড়যন্ত্র আর আওরঙ্গজেবের মতো বংশানুক্রমিক শাসনের তত্ত্বও টেনে এনেছেন।
অন্যদিকে, ভোটের কিছুদিন আগেই কংগ্রেস এটা অনুভব করতে শুরু করে, গুজরাটে তাদের জেতার সম্ভাবনা আছে। তখন থেকেই রাহুল গান্ধী গুজরাটের মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন। অক্লান্ত প্রচার চালিয়েছেন, হার্দিক-অল্পেশ-জিগনেশদের নিজের শিবিরে টেনে এনেছেন। একের পর এক হিন্দু মন্দির দর্শন করতে যাওয়ায় তার বিরুদ্ধে ‘সফট হিন্দুত্বে’র অভিযোগও উঠেছে, রাহুল গান্ধী গায়ে মাখেননি।
‘‘গুজরাটে আজকের ফল এটাই প্রমাণ করছে, ২০১৯’র সাধারণ নির্বাচন বিজেপির জন্য জয় মোটেও অনায়াস হবে না। যারা ধরে নিয়েছিলেন, মোদি-অমিত শাহ’র জুটি আরও একবার হাসতে হাসতে ভারতের ক্ষমতায় আসবে, তাদের অবশ্যই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে এই ফল।’’, বাংলা ট্রিবিউনকে কথাগুলো বলছিলেন সিপিআইএম নেতা ও অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান মহম্মদ সেলিম।
তার মতে, গুজরাটের মতো দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতেই যদি বিজেপিকে কোনোমতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হয়, তাহলে বোঝাই যাচ্ছে অন্য রাজ্যগুলোতে বিজেপির জন্য লড়াইটা ক্রমশ আরও কঠিন হয়ে উঠছে। নোট বাতিল বা জিএসটি কর চালু করার ধাক্কায় মানুষের রুটিরুজি যেভাবে বিপন্ন, গুজরাটে তারই ফল দেখা গেছে বলে মনে করছেন মহম্মদ সেলিম।
নরেন্দ্র মোদি দেশের ক্ষমতায় আসার পর সাড়ে তিন বছর কেটে গেছে। পরের নির্বাচন আর ঠিক বছর দেড়েক পর। ফলে এখন এই মিড-টার্মে প্রধানমন্ত্রীর ‘অ্যাপ্রুভাল রেটিং’ নিয়ে যদি বিজেপি’র চিন্তা বাড়ে, তাহলে আবার বলতে হয়— বহু বহু দিন বাদে বিরোধী কংগ্রেস শিবিরে শুরু হয়েছে রাহুল গান্ধীকে নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখার পালা।
শিলচরের কংগ্রেস এমপি ও দলের জাতীয় মুখপাত্র সুস্মিতা দেব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কংগ্রেসের নতুন সভাপতি প্রমাণ করে দিয়েছেন, ২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদির একমাত্র চ্যালেঞ্জার তিনিই। তাও সেটা করেছেন কোথায়— গুজরাটের মতো বিজেপির ঘাঁটিতে। রাহুল গান্ধীকে যারা এতদিন সিরিয়াসলি নেননি, যারা বলে এসেছেন যে নরেন্দ্র মোদির সামনে তিনি কোনও চ্যালেঞ্জই ছুঁড়তে পারবেন না, তাদের জন্য গুজরাটের ফল স্পষ্ট জবাব।’
মাত্র দু’দিন আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে মা সোনিয়া গান্ধীর হাত থেকে কংগ্রেসের সভাপতিত্ব নিয়েছেন রাহুল গান্ধী। তার ঠিক পরেই গুজরাটে ভরাডুবি হলে তার নেতৃত্বের সূচনা যে অত্যন্ত বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে শুরু হতো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গুজরাটে সামান্য ব্যবধানে পরাজয়ের পর কংগ্রেস এই ফলাফলকে তাদের ‘নৈতিক বিজয়’ হিসেবে দেখছে। আর কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে রাহুল গান্ধীর ইনিংসও শুরু হচ্ছে রীতিমতো সমীহ জাগিয়ে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির বিশাল জয়ের পর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। একমাত্র পাঞ্জাব ছাড়া বাকি প্রায় সব রাজ্যেই খর্ব হয়েছে কংগ্রেসের প্রভাব-প্রতিপত্তি। অবশেষে ২০১৭’র ডিসেম্বরে এসে গুজরাটই তাদের নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে। আর সেটা বিজেপির কপালে ফেলছে দুশ্চিন্তার ভাঁজ।
গোপালগঞ্জে কোনোদিন আওয়ামী লীগকে কষ্ট করে জিততে হলে তা যে সংকেত দেবে, গুজরাটের ফলাফলও ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি’র জন্য ঠিক সেই একই বার্তা বহন করে আনলো।

মতামত দিন