সারাদেশে হঠাৎ কেন ডেঙ্গুর এত ভয়াবহ বিস্তার

ডেঙ্গু এবার তার আগের ধরন বদলে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে।নতুন ধরনের এক ডেঙ্গু আতংক আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।এতদিন প্রাণঘাতী এই রোগের প্রকোপ ঢাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এবার তা ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় সারাদেশে। এরই মধ্যে ডেঙ্গুতে অন্তত ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, এ সংখ্যা ৫। সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সবাই এ ব্যাপারে সচেতনতার কথা বলছে, শোভাযাত্রা করছে। কিন্তু কেউ দায় নিচ্ছে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিলে এমন পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হতো না। তারা বলছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতীয়ভাবে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করলে এর প্রকোপ কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা। যাদের অবহেলায় এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়লো দেশ, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনারও দাবি জানান তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য হাসপাতালগুলোতে প্রথমদিকে পৃথক করে বেড স্থাপন করা হলেও পরে সেটি ধরে রাখা যায়নি। বর্তমানে রাজধানী ঢাকার প্রায় প্রতিটি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর অত্যধিক চাপ। কোথাও কোথাও বেড না পেয়ে ফ্লোরিং করছেন তারা। সরকারি হাসপাতাল থেকে ফিরে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে কাউকে কাউকে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ঢাকার ১৩টি সরকারি ও ৩৬ বেসরকারি হাসপাতালে মোট ৭ হাজার ৭৬৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৫ হাজার ৯৩৮ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৪৭৩ এবং বেসরকারি হাসপাতালে ১৩১। ঢাকার বাইরেও শনাক্ত হয়েছেন একাধিক ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী।

সোমবার (২২ জুলাই) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন হবিগঞ্জ জেলার সিভিল সার্জন ডা. শাহাদাত হোসেন। এর আগে ঢাকায় আরেক নারী চিকিৎসক ডেঙ্গুতে মারা যান।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার বাইরে বরিশাল বিভাগে ৮ জন ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৬ জন। খুলনা বিভাগে এ পর্যন্ত ৪০ ডেঙ্গু রোগীর কথা জানা গেছে। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৯ জন। চট্রগ্রাম বিভাগের ৮ জনের মধ্যে ৪ জন আছেন হাসপাতালে।

চট্রগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির বলেন, পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক না হলেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ৫ দিন আগে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন মাত্র ৭ জন রোগী। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৪৩। মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) একদিনেই ভর্তি হয়েছেন ১০ ডেঙ্গু রোগী।
যদিও তিনি বলেন, দুজন বাদে এসব রোগীর বেশির ভাগের কেস হিস্ট্রি বলছে, তারা গত দুই সপ্তাহে ট্র্যাভেল করেছেন।

তবে একাধিক চিকিৎসক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরে ঢাকার হাসপাতালগুলোর রোগীর সংখ্যাই ঠিকমতো তালিকাভুক্ত হয় না, সেখানে ঢাকার বাইরের সংখ্যা সঠিকভাবে তালিকাভুক্ত হওয়ার আশা করা কঠিন।

ঢাকার গ্রিন রোডের একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক বলেন, চট্টগ্রামের বেশ কিছু হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। কিন্তু তথ্য জানানো হয়েছে কিনা, সেটা কেউ বলতে পারছে না। মৃত্যু হলে ডেঙ্গু রোগী কিনা, সেটাও নিশ্চিত হতে সময় লাগছে। তাই কন্ট্রোল রুমের তথ্য পেতে দেরি হচ্ছে। ঢাকায় বসে ঢাকার বাইরের সব রোগীর বিষয়ে তারা কীভাবে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হবে, সেটাও স্পষ্ট নয়।

মৌলভীবাজারে কর্মরত ডা. শাব্বির হোসেন খান বলেন, মৌলভীবাজারে তারা দুজন ডেঙ্গু রোগীর খোঁজ পেয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ মূলত ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ ছিল। সেসময়ে ঢাকায় এডিস মশার প্রজননস্থল পুরোপুরি ধ্বংস করা গেলে ডেঙ্গু সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।
জনস্বাস্থ্য বিশষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, দেশব্যাপী ডেঙ্গুর বিস্তার ভয়াবহ পর্যায়ে চলে গেছে। এর মধ্যে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন মশা মারার জন্য যে ওষুধ ছিটিয়ে আসছিল, তা কার্যকর নয়। শুরুর দিকে চিকিৎসকরা ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াইয়ে অনভিজ্ঞ ছিল। জনমানসেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। তবে এখন সে অবস্থা নেই।
তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকরা এখন ডেঙ্গু চিকিৎসায় সামর্থ্যবান। একটি জাতীয় গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে। এরপরও এবছর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার ভয়াবহ বৃদ্ধি এবং মৃত্যুর হার বিপদের ভয়াবহতা প্রকাশ করে।’

জনস্বাস্থ্য আইন বিশেষজ্ঞ আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ অনুসারে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে উৎপাদনস্থল ধ্বংসে ব্যক্তির পাশাপাশি সংস্থাগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের উচিত প্রথমে সব নাগরিককে এবং ওয়ার্ডের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিজ নিজ এলাকায় এডিস মশার প্রজননস্থল পরিষ্কারের নির্দেশ দেওয়া। একটি মনিটরিং সেল স্থাপন করা প্রয়োজন। যেখানে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে পারবে সবাই।
যেসব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এসব নির্দেশনা পালনে ব্যর্থ হবে তাদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সংক্রামক ব্যাধি আইনে অনুসারে অনূর্ধ্ব ৩ মাস কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া সম্ভব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইসিডিডিআরবি’র একাধিক গবেষক বলেন, মশা মারার ওষুধ যে কাজ করছে না, তা প্রায় দেড় বছর আগে তারা সিটি করপোরেশনকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু করপোরেশন কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। ব্যবস্থা নিলে ডেঙ্গু এমন ভয়াবহ আকার নিতে পারতো না।বাংলা ট্রিবিউন

মতামত দিন