রীতিনীতির আমূল পরিবর্তন হোক- অ আ আবীর আকাশ

জর্ডানের রানি রানিয়া আবদুল্লাহ ১৯৭০ সালের ৩১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। মিসরের কায়রোর আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে ডিগ্রি অর্জন করেন রানিয়া আল আবদুল্লাহ। তিনি জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়নের লক্ষ্যসমূহ অর্জনে কাজের জন্য সারা বিশ্বে পরিচিত। অ্যাপল ইনকরপোরেশনে বেশ কয়েক বছর কাজের অভিজ্ঞতা আছে রানির। তিনি ২৩ অক্টোবর ২০১১ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে এই বক্তব্য রাখেন

আজ সকালে তোমাদের সবাইকে নিয়ে ভিন্নভাবে নতুন কিছু চিন্তা করা শিখতে চাই। আমরা কি প্রচলিত নিয়মকানুন, রীতি-নীতিকে বদলিয়ে ভিন্ন কিছু, নতুন কিছু শুরু করতে পারি না!

আমি কিন্তু আমাদের সরকার বা প্রশাসনের আইনকানুন কিংবা ভাষাবিজ্ঞান বা অর্থনীতির কোনো নিয়ম ভাঙার কথা বলছি না। আমি আমাদের সাধারণ জীবনে প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানের কিছু প্রচলিত নীতিকেই বদলে দেওয়ার কথা বলতে চাই।

একটু ব্যাখ্যা করে বলি, আমরা জানি, এখন আরব বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ তরুণই বেকারত্বের ঝুঁকিতে আছে। এই সংখ্যা পৃথিবীর অন্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। নারীদের বেকারত্বের হার আরও হতাশাজনক। উল্টোদিকে এই অঞ্চলের জীবনযাত্রার খরচ প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ কোটি ডলার। এই বিশাল অর্থ ব্যয়ের জন্য আমাদের সমাজের গতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের গতি ধীরে ধীরে শামুকের মতো শ্লথ হয়ে উঠছে। সবচেয়ে হতাশার কথা হলো, আমাদের এ ধরনের সমাজ ও আর্থিক ব্যবস্থার কারণে আমাদের প্রজন্মের সব মানুষ হতাশ ও দিশাহারা।

১০ বছর ধরে বেকারত্বের এই ধারা অসহ্য পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। আমরা যদি সাধারণ মানুষকে তাদের প্রত্যাশিত কাজের সুযোগ করে দিতে চাই, শান্তি ও উন্নয়নের ধারায় আনতে চাই, তাহলে আমাদের এখনই কাজ শুরু করতে হবে। তবে সেই কাজের শুরুটা হতে হবে একটু ভিন্ন। আর আট-দশটা কাজের মতো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, সমাজ পরিবর্তনের জন্য তোমার মতো করে কিছু কিছু নিয়ম ডিঙাতেই পারো। চলো সমাজের উন্নয়ন, প্রগতির জন্য প্রচলিত রীতিনীতি ডিঙিয়ে যাই। আমাদের এই নিয়ম-কানুনকে ডিঙাতে হবেই, কারণ প্রচলিত নিয়মের কঠিন ভার আমাদের কাঁধেই ভর করে।

শুরুতেই নজর দেওয়া যাক তাপগতিবিজ্ঞানের প্রথম নিয়মের দিকে। এই নিয়মমতে, মহাবিশ্বে শক্তি ও পদার্থকে নতুন করে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না। ভিন্নভাবে আমরা বলতে পারি, তুমি আসলেই শূন্য থেকে কোনো কিছুই সৃষ্টি করতে পারবে না। এই নিয়মকেই আমাদের প্রতিনিয়ত ডিঙিয়ে সামনে যেতে হবে। আমাদের তরুণদের বিরাট এক অংশ তাদের পা জুতা থেকে বাইরে আনতে চায় না। তারা মনে করে, সরকারি চাকরিতেই তাদের সব নিরাপত্তা লুকিয়ে আছে। আমাদের আগামী প্রজন্মের সদস্যদের চিন্তাচেতনাকে পুননির্মাণ করতে হবে। তাদের আত্মবিশ্বাস জোগাতে আশার আলো দেখাতে হবে। বোঝাতে হবে, আকাঙ্ক্ষার সীমা নেই, প্রত্যাশার কোনো শেষ নেই।

এ জন্য আমাদের গুণগত শিক্ষার বিকাশ করতে হবে, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। উদ্যোক্তা হিসেবে তাদের ক্রিটিক্যাল থিংকিং, টিমওয়ার্ক, দ্রুততার সঙ্গে সমস্যার সমাধান, স্ব-উদ্যোগ স্থাপন, পারস্পরিক যোগাযোগ ও নেতৃত্ব বিকাশে উৎসাহ দিতে হবে। প্রায়োগিক শিক্ষা অর্জনের পরই তুমি শুরু করতে পারো তোমার উদ্যোগ। যখন একজন উদ্যোক্তা তৈরি হয়, তখন সে আরও তিন-চারটে নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে। এভাবে একক থেকে দশক, দশক থেকে সহস্র সুযোগ। শূন্য থেকে এভাবেই তো নতুন কিছুর সৃষ্টি হয়!

এরপর আমাদের ভাঙতে হবে নিউটনের গতির প্রথম সূত্র। এই নিয়ম বলে, বস্তুর ওপর যদি বাইরের কোনো চাপ বা কোনো শক্তি প্রয়োগ করা না হয়, তাহলে বস্তু যে গতিতে ছিল সেই গতিতেই থাকবে। বাইরের কোনো শক্তি ছাড়া বস্তুর অবস্থা অপরিবর্তিত থাকবে।

বলা হয়, আমরা নাকি বাইরের শক্তির সাহায্য ছাড়া আমাদের বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের হার কমাতে পারব না। কিন্তু এই কথা সত্য নয়। আমরা আমাদের প্রজন্মের সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দিলেই আমরা নিউটনের সূত্রকে ডিঙাতে পারব। আমরা যদি নতুন উদ্যোগ ও উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করি, কঠিন কঠিন সব সরকারি নিয়মের বাধা কমিয়ে দিই, সব ক্ষেত্রে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমাতে পারি, তাহলেই আমাদের তরুণদের উদ্যোগ আলোর মুখ দেখবে। ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উদ্যোগ তো নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টিতে ডায়নামো হিসেবে কাজ করে!

তারুণ্যের উদ্যোগ ভাবনাকে আমাদের ভুল বুঝলে চলবে না। আমাদের একটাই কাজ করলে হবে, তারুণ্যকে তার মতো চলতে দাও। আমরা শুধু তরুণদের ঝুঁকি গ্রহণের উৎসাহ দিতে পারি, সাহস দিতে পারি। আমরা শিশুদের ভবিষ্যতে কীভাবে বড় সুযোগ আয়ত্ত করতে হবে, তা জানাতে পারি। আগামী প্রজন্মকে প্রত্যাশা ও চাহিদা সীমার দেয়ালকে টপকাতে শিক্ষা দিতে পারি। আজ এখানে যারা আছো, তোমাদের প্রত্যেকেরই আছে ব্যক্তিগত কল্পনা ও নিজস্ব লক্ষ্য। তোমার উদ্ভাবনী চিন্তা দিয়ে তোমার উদ্যোগকে সামনে এগিয়ে নিয়েযাও। বাস্তবে পরিণত কর তোমার স্বপ্নকে, বদলে দাও প্রচলিত রীতিনীতির। তোমাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

লেখক: কবি কলামিস্ট ও সাংবাদিক।
সম্পাদক: আবীর আকাশ জার্নাল।

মতামত দিন