চট্টগ্রামে ২০ আদালতে বিচারক নেই- হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের উদ্বেগ

চট্টগ্রামের জেলা ও মহানগরের ৯০ টি আদালতের মধ্যে প্রায় ২০ টিতে বর্তমানে বিচারক নেই। বিচারিক আদালতগুলোর মধ্যে ২০টি আদালতে না থাকাকে তীব্র সংকট হিসেবে উল্লেখ করে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন-বিএইচআরএফ।

সোমবার দুপুরে আইনজীবী ভবনে সংগঠনের পরিচালক (অর্গানাইজিং) এডভোকেট জিয়া হাবীব আহ্‌সানের সভাপতিত্বে ও চট্টগ্রাম শাখার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এডভোকেট এ.এইচ.এম জসীম উদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় বক্তাগণ উক্ত বিচারক সংকটের করুন চিত্র তুলে ধরেন ।

বক্তাগণ বলেন ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিয়ে কোন রকমে চলছে চট্টগ্রাম আদালত সমূহের বিচার কাজ । বিচারকের সংকটে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে আছে। দৈনন্দিন আদালত-গুলোতে বিচারক সংকটের কারণে পুরনো মামলার যেমন নিষ্পত্তি হচ্ছে না তেমনি প্রতিদিন নতুন মামলা দায়ের হওয়ায় বাড়ছে মামলার জট । চরম ভোগান্তিতে পড়ছে মামলার বিপুল সংখ্যক বিচারপ্রার্থী জনগোষ্ঠী । দীর্ঘদিন ধরে বিচারক শূন্যতার কারণে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় এবং বিচার প্রার্থী জনগোষ্ঠীর হয়রানী ও ব্যাপক ক্ষতি সাধন হচ্ছে । দূর-দূরান্ত বিভিন্ন জেলা এবং দুর্গম এলাকা ছাড়াও বিদেশ হতে প্রবাসী আগত বিচার প্রার্থী জনগোষ্ঠী বিচারক না থাকায় শুধুমাত্র হাজির হয়ে তারিখ পরিবর্তনে বিদায় নিতে হয়, যা আমদের বিচার ব্যবস্থার জন্য খুবই দুঃখজনক এবং বিচারপ্রার্থীগণ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে । বর্তমানে ৯০ টি আদালতের মধ্যে প্রায় ২০ টি তে নেই বিজ্ঞ বিচারক । ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার ও মামলার জট কামানোর স্বার্থে নতুন আদালত সৃষ্টির পাশাপাশি বিজ্ঞ বিচারক নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন । বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে চট্টগ্রাম বিভাগের দুর্নীতি ও চাঞ্চল্যকর মামলার বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয় । বর্তমানে আদালতটিতে বিচারাধীন রয়েছে প্রায় ৭শ’র অধিক মামলা ।

তাছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা প্রায় আড়াইশ মামলার তদারকি করছে । বিশেষ এই আদালতে এখন চলছে বিচারক সংকট । গত ৭ই জানুয়ারি এই আদালতের বিজ্ঞ বিচারক রুহুল আমিন বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন । বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল অত্যন্ত গুরত্বপুর্ণ একটি আদালত যেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে অন্যান্য আদালত থেকে গুরুত্বপূর্ণ মামলা দ্রুত নিস্পত্তির জন্য বদলী করা হয় । বর্তমানে এই ট্রাইবুনালে ও বিচারক শুন্য থাকায় প্রায় ১শ’র বেশি গুরুত্বপূর্ণ চাঞ্চল্যকর মামলা বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে । ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারী বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক মোঃ মহিতুল হক এনাম চৌধুরীকে সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে বদলি করার পর থেকে এই ট্রাইব্যুনালের বিচারক সংকট শুরু হয় । দীর্ঘদিন ধরে বিচারক শূন্য থাকার পর গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিজ্ঞ বিচারক হোসনে আরা বেগমকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেয় আইন মন্ত্রণালয় । কিন্তু কাজে যোগ না দিয়ে তিনি অন্য জায়গায় বদলি হয়ে চলে যান । পরবর্তীতে আবার গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর নরসিংদীর বিজ্ঞ বিচারক মোজাম্মেল হক চৌধুরীকে উক্ত ট্রাইবুন্যালে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় । কিন্তু তিনি মাত্র দুই মাস কাজ করার পর গত বছরের নভেম্বরে অন্যত্র বদলি হয়ে যান । এরপর থেকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যাল বিচারক শূন্য আছে ।

অপরদিকে দীর্ঘদিন যাবৎ চট্টগ্রামে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত ও পারিবারিক আদালতে বিজ্ঞ বিচারক শূন্য থাকায় বিচারের অপেক্ষায় ঝুলে ছিল সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশী মামলা । এতে করে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় সকল মামলার পক্ষগণকে । কিন্তু বর্তমানে ৭টি নারী শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারক নিয়োগ দেওয়ায় বিচারপ্রার্থীদের দূর্ভোগ কমতে শুরু করেছে । পারিবারিক এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো ১৮০ দিনের মধ্যে মামলার বিচারকাজ শেষ করার আইনী বিধান রয়েছে কিন্তু বিজ্ঞ বিচারক সংকট থাকায় তা উপেক্ষিত হয়েছিল । বিভিন্ন আদালতে বিচারক না থাকায় দিনের পর দিন মামলার নতুন নতুন তারিখ পড়তে থাকে । একই সাথে প্রতিদিন নতুন নতুন মামলা দায়ের হওয়ায় মামলার জট আরও বেড়ে গিয়েছে । বিজ্ঞ বিচারক না থাকায় মামলার বিচার কাজ সম্ভব হয়নি । ফলে নতুন তারিখ নির্ধারণ করেই মামলা রেখে দেয়া হয় । ফলে পুরানো মামলা যেমন নিস্পত্তি হয়নি তেমনি প্রতিদিন নতুন মামলা যোগ হওয়ায় বেড়েছে জট । বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ছাড়াও চট্টগ্রামের আর ১৮ টি আদালতে রয়েছে বিজ্ঞ বিচারক সংকট । তার মধ্যে জেলা জজশিপের অধীনে দেউলিয়া আদালত, ৩য়, ৪র্থ, ৬ষ্ঠ এবং ৭ম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, সন্দীপের সিনিঃ সহঃ জজ, পটিয়া চৌকির আওতাধীন চন্দনাইশ আদালতের সহঃ জজ, পটিয়া চৌকির অতিঃ আদালতের সহঃ জজ, সাতকানিয়া চৌকির অতিঃ আদালতের সহঃ জজ, সাতকানিয়া চৌকির লোহাগড়া আদালতের সহঃ জজ, বাশখালী চৌকির সহঃ জজ আদালতগুলোতে রয়েছে বিজ্ঞ বিচারক সংকট । তাছাড়াও ১ম, ২য়, ৩য় এবং ৪র্থ অতিঃ মহানগর দায়রা জজ এবং চীফ জুড়িশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অধীনে ২য় জুড়িশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে বিচারক নেই । এইসব আদালতে রয়েছে ২৯ হাজার মামলা ।

রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয় যে, চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরীর বিশাল এলাকা একটি মাত্র অর্থঋণ আদালত দিয়ে বহু কষ্টে চলছে । এক সময় চট্টগ্রামে ৪/৫টি বাণিজ্যিক আদালত ও অর্থ ঋণ আদালত থাকলেও বর্তমানে একটি মাত্র আদালত থাকায় ব্যাপক মামলা জট সৃষ্টি হয়েছে । ফলে আদালতের কার্যক্রমে মামলার পরবর্তী তারিখ ২/৩ মাসের আগে হয় না । অথচ ০৬ মাসে এ মামলা শেষ করতে হয় । ফলে খেলাপী গ্রাহকদের পোয়াবারো অবস্থা ও ব্যাংকগুলোর ত্রাহি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে । বাণিজ্যিক রাজধানীর ব্যাংকগুলোকে খেলাপী ঋণের গ্রাস থেকে রক্ষা করতে হলে ঢাকার মত চট্টগ্রামেও অন্ততঃ আর ও ৪টি অর্থ ঋণ আদালত স্থাপন অতীব জরুরী হয়ে পড়েছে । সরকার ও রাষ্ট্র এবং মহামান্য বিচার বিভাগ বিষয়টির গুরত্ব বিবেচনায় এনে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চট্টগ্রামের বিচারক শূন্য আদালতে বিজ্ঞ বিচারক নিয়োগ সম্ভব । কেননা বিলম্বিত বিচার ব্যবস্থায় বিচার হীনতার নামান্তর।

বক্তাগণ দ্রুত বিচারক নিয়োগের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে মাননীয় প্রধান বিচারপতি, আইনমন্ত্রী, আইন সচিব- এর আশু দৃষ্টি কামনা করেন । সভায় অন্যান্যদের মধ্য বক্তব্য রাখে মানবাধিকার আইনজীবীবৃন্দ যথাক্রমে এডভোকেট সুনীল কুমার সরকার, এডভোকেট সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, এডভোকেট সৈয়দ মোহাম্মদ হারুন, এডভোকেট দেওয়ান ফিরোজ আহম্মেদ, এডভোকেট প্রদীপ আইচ দীপু, এডভোকেট সাইফুদ্দিন খালেদ, এডভোকেট হাসান আলী ও এডভোকেট বদরুল হাসান প্রমুখ ।
# প্রেস বিজ্ঞপ্তি

সংবাদ প্রেরক

এএইচএম জসীম উদ্দিন
এডভোকেট

মতামত দিন