বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তহাটে একতরফা বাণিজ্য সুবিধা নিচ্ছে ভারত!

এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই :

নানা অনিয়ম অব্যবস্থাপনার মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তহাট থেকে একতরফা সুবিধা লুটে নিচ্ছে ভারত । নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তজার্তিক ব্যন্ডের পণ্য অবাধে বিক্রি হওয়ার সুযোগে ক্রেতা সেজে অবৈধ ব্যবসায়ীরা অবাধে শুল্কমুক্ত ভারতীয় পণ্য দেশে ঢুকায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সরকার ।

গত ২৭ আগস্ট সীমান্তহাটের ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণে গিয়ে সীমান্তহাটে বিরাজমান নানা অনিয়ম ও বাংলাদেশীদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলেছেন ফেনী জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজজামান । তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের সাথে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণের জন্য দু’দেশের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সীমান্ত বাজার চালু করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে দুই দেশের নাগরিকদের সীমান্ত বাজারের নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না। নিয়ম রয়েছে বাজারের পাঁচ কিলোমিটার দূরুত্বের লোকজন ক্রেতা-বিক্রেতা হিসেবে বাজারে ব্যবসা পরিচালনা করবে। কিন্তু দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন এসে ভারতীয় মালামাল ক্রয় করে নিয়ে যায়। আর এদিকে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন তাদের মালামাল সেই হারে ভারতীয়রা নিচ্ছে না। এজন্য তারা লোকসান গুনছে। তিনি আরো বলেন, উভয় দেশের নাগরিকদের সীমান্ত বাজারের নীতিমালা অনুসরণ করে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে এবং তিনি সবাইকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলারও অনুরোধ জানান । বাংলাদেশের ফেনীর ছাগলনাইয়ার মধুগ্রাম সীমান্তে এবং ভারতের ত্রিপুরার শ্রীনগর সীমান্তে বর্ডারহাট পর্যবেক্ষণ শেষে সীমান্ত হাটের সার্বিক দিক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের জানান, এ সীমান্ত হাটে বাংলাদেশী ক্রেতারা ভারতীয় বিক্রেতাদের নিকট থেকে প্রয়োজনের তুলনায় অধিক পণ্য ক্রয় করছে। অন্য দিকে ভারতীয় ক্রেতারা প্রয়োজনের চেয়েও কম পণ্য ক্রয় করতে দেখলাম। জেলা প্রশাসক বলেন, প্রয়োজনের চেয়ে আমরা যারা অধিক পণ্য ক্রয় করছি তাদের মাঝে দেশ প্রেম ঘাটতি আছে। জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত বাংলাদেশী ক্রেতাদের প্রদেয় আইডি কার্ডটি দেখালেও হাটে প্রবেশ করতে দিচ্ছেনা কেনো? এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, কিছু লোক আমার স্বাক্ষর নকল করে এমন আইডি কার্ড তৈরী করেছে বিধায় তাদের হাটে প্রবেশে অনুমতি দিচ্ছেনা। আবার অনেকের আইডি কার্ডের মেয়াদ শেষ তাই প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছেনা। তবে মেয়াদ থাকা আসল আইডি কার্ড থাকলে অবশ্যই তাদের হাটে প্রবেশে অনুমতি দেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, ছাগলনাইয়ার মোকামিয়া সীমান্তে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে চালু হওয়া বর্ডারহাট ঘিরে একশ্রেণির চোরাকারবারি ও অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট গড়ে ওঠেছে শুরু থেকেই। পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় বসবাসকারী দু-দেশের নাগরিকরা শুধু তাদের নিদিষ্ট কিছু স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী বর্ডারহাটে বেচা-কেনার সুযোগ থাকার কথা থাকলেও ভারতীয় ব্যবসায়ীরা শুরু থেকে অসংখ্য নিষিন্ধ ও আন্তজাতিক ব্যান্ডের পণ্য সামগ্রী সীমান্তেহাটে অবাধে বিক্রি করে আসছেন । এ নিয়ে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশীরা। মূল্য তালিকা না থাকায় অতিরিক্ত দাম হাকিয়ে নেয়ারও অভিযোগ দীর্ঘদিনের । মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির অভিযোগ করলেও ক্রেতারা প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তারপরও প্রতিদিনই দেশের দূর-দুরান্তের জেলা-উপজেলা থেকে মানুষের সমাগম বাড়ছে সীমান্তহাটে । সীমান্ত বাজার থেকে দু-দেশের পাঁচ কিলোমিটার এলাকার বাসিন্দারা তাদের স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শাকসবজি,বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী, কোমলপানীয়, বাঁশ বেত,গামছা, লুঙ্গি জাতীয় পণ্য, কৃষি উৎপাদন সামগ্রীর মধ্যে দা,লাঙ্গল, কুড়াল, শাবল ইত্যাদি এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিক গামেন্ট সামগ্রী,মেলামাইনসহ নিদিষ্ঠ কিছু পণ্য বেচা-কেনার কথা বলা হয়েছিল । বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা মাছ,সুটকি, মুড়ি-চানাচুর,বিস্কুটসহ অল্প সংখ্যক কিছু হাতে গোনা কয়েকটি পণ্য বিক্রি করছেন।
অপরদিকে, সীমান্তহাটে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা ও বিদেশী বিভিন্ন জাতের মসলা,শাড়ি,থ্রী পিছ,হরলিক্স,গার্মেন্ট সামগ্রী, প্রসাধনী সামগ্রী, সাবান, চা,টেংক,তেল,দুধ,কলা, পাউডারসহ প্রায় অসংখ্য দেশী ও আন্তজার্তিক ব্যন্ডের পণ্য অবাধে বিক্রি করছেন । এক সময়ে পণ্যের পসরা বসিয়ে বেশিরভাগ ভারতীয় দোকানী পণ্য বিক্রি করলেও বর্তমানে তাদের বেশিরভাগ পাইকারী বিক্রির প্রতি আগ্রহ বেশি বলে কয়েকজন ক্রেতা জানান । বিনা শুল্কে ওই বিদেশী পণ্য দেশে প্রবেশ করায় রাষ্ট্র ও সরকর আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বলে সচেতন মহলের অভিযোগ । এতে চোরাকারবারি ও এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট সাধারণ ক্রেতা সেজে বিনা-শুল্কে সীমান্তহাট দিয়ে এনে ফেনী ও পাশ্ববর্তী জেলা ও উপজেলার হাট-বাজারে সরবহরাহ করছে এমন অভিযোগ রয়েছে ।
জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর ভারতের ত্রিপুরার শ্রীনগরের কৃঞ্চনগর পঞ্চায়েত ভবনে দু-দেশের মধ্যে বৈঠকের পর মোকামিয়া সীমান্তহাটের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল । বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠকের পর ২০১৫ সালের ১৩ জানুয়ারি ফেনীর ছাগলনাইয়ার মোকামিয়ায় ও ভারতের ত্রিপুরার শ্রীনগর সীমান্ত এলাকায় জিরো পয়েন্ট থেকে দু-দেশের জায়গায় স্থাপিত বর্ডারহাটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের ও ভারতের তৎকালীন বাণিজ্য মন্ত্রী। সীমান্তহাট চালুর মাধ্যমে কাটাতারে বাঁধায় বিচ্ছেদে পড়া সীমান্তবর্তী দু-দেশের নাগরিকদের মিলন মেলায় সীমান্তহাট দারুন ভুমিকা রাখবে বলে আশায় বুক বেধে ছিলেন সীমান্তবাসীরা । দু-দেশের কয়েক যুগের বিচ্ছেদ ঘটিয়ে নাড়ীরটানে সীমান্তবর্তী মানুষকে কাছাকাছি এনে দিয়েছে সীমান্তহাট। কিন্তু শুরু থেকে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা দু-দেশের মধ্যে পণ্য বিক্রির শর্ত না মানা, ভারতীয় কাস্টমসের বাঁধার কারণে ভারতীয় ক্রেতারা চাহিদা মতো বাংলাদেশী পণ্য না কেনায় বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার অভিযোগে সীমান্তহাট বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটে অচল হয়ে কয়েক হাটবার বাজার বসেনি । অচলতা নিরসনে দু-দেশের মধ্যে বৈঠকে বাঁধা অপসারণের কথা বলা হলেও কার্যত ভারতীয়রা চাহিদামতো পণ্য না কেনায় বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা এখনো ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে । এতে সীমান্তহাটে ভারত কোটি কোটি টাকার পণ্য বিক্রির মাধ্যমে একতরফা বাণিজ্য সুবিধা নিচ্ছে বলে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ।

মতামত দিন