লামা হিসাবরক্ষণ অফিসের ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম ও হয়রাণী

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, নিজস্ব সংবাদদাতা, লামা:
বান্দরবানের লামা উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ঘুষ-অনিয়ম-দুর্নীতি ও হয়রাণীর অভিযোগ উঠেছে। টাকা ছাড়া ওই অফিসে কোনো কাজই হয় না। এ ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে অনেক ভুক্তভোগী সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হয়রাণী থেকে রেহাই পেতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

ভূক্তভোগীদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, হিসাবরক্ষণ অফিসের অনিয়ম দুর্নীতি দীর্ঘদিনের। নতুন যে কর্মকর্তা কর্মচারী আসে সেই জড়িয়ে পড়ে ঘুষ-অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যে। বর্তমান লামা উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা কাজী আনিছুল ফিরদাউস ২০১৯ সালের ৪ঠা এপ্রিল অত্র অফিসে যোগদান করেন। এরপর থেকেই তিনি ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তার অফিসে টাকা ছাড়া কোনো কাজই হয় না। সে সহ তার অফিসের দুইজন অডিটর প্রদীপ পাল ও হারাধন সেন এর বিরুদ্ধে রয়েছে অভিযোগের পাহাড়। এই অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জিপিএফ হিসাব নম্বর খোলা, বেতন নির্ধারণ, পেনশন, বকেয়া বিল, জিপিএ চূড়ান্ত বিলসহ কোনোকিছুই মোটা অঙ্কের উৎকোচ ছাড়া স্বাক্ষর করেন না।

সম্প্রতি লামা শিক্ষা বিভাগের প্রায় ৮৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শিক্ষকদের টিএ, মেরামত, শান্তিবিনোদন ও বেতন-বোনাসের বিল জমা দেয় হিসাবরক্ষণ অফিসে। উক্ত বিলে নানা অজুহাত তুলে হয়রাণী করলে এই বিষয়ে ক্ষুব্দ হয়ে শিক্ষা বিভাগের জনৈক কর্মচারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সামান্য একটি পোস্ট দিলে সেখানে হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পোস্টের কমেন্টে অনেকে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন কাজের বিনিময়ে ৫ থেকে ৮% কমিশন দাবীর অভিযোগও তুলেন।

হিসাবরক্ষণ অফিসের অনিয়ম বন্ধে দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা করে এক সাংবাদিক ফেইসবুকে পোস্ট দিলে লামা শিক্ষা অফিসের কর্মচারী জাহেদুল ইসলাম জাহেদ লিখেন “হ ভাই জাতি জানতে চায় এভাবে আর কত!?? অনিয়ম যেখানে দুর্বিনীতভাবে বসতি গেঁড়ে বসেছে ঐ অফিসের সমস্ত অস্থিমজ্জায়!?!”
এক সহকারী শিক্ষক নাসির উদ্দিন দস্তগীর লিখেন, “এদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সোচ্চার হবার এখনি সময়। জিপিএফ হিসাব টাও টাকা ছাড়া দেয় না। অমানুশের বাচ্চা অমানুষ গুলো।” আরেক সহকারী শিক্ষক মো. ইয়াছির আরাফাত লিখেন, “শুধু লামায় নয়, দেশজুড়ে এদের উৎপাত। এদের অবস্থা দেখলে মনে হয় আজরাঈল ঘুষ খায়। এদের কারণে প্রত্যেক সেক্টরে দুর্নীতি বহুগুণ বেড়ে যায় কারণ ঘুষ ছাড়া বিল ছাড় দেয় না। আবার অনেক ভুঁয়া বিলও ঘুষের বিনিময়ে করে। বিশেষ করে জুন মাসে বিভিন্ন বরাদ্দ, বিল, ভাউচারে এদের উৎপাত বেশী।” লামামুখ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর শুক্কুর হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিষয়ে লিখেন, “সব ঘোষ খুরেরা নির্লজ্জ। পতিতা আর ঘোষখুর তাদের অভিন্ন চরিত্র।”

লাইনঝিরি মোহাম্মদিয়া দাখিল মাদ্রাসার এক শিক্ষক মোঃ শাহে নেওয়াজ লিখেন, “যারা ইউএনও এর বিল থেকে টাকা খায়। তাদের বিচারটা কে করবে। এরকম বড় অফিসাররা নিরব থাকে। নিরবতা সম্মতির লক্ষণ। মানে হারামের পক্ষে।” আকরাম হোসেন জুয়েল নামে এক সহকারী শিক্ষক লিখেন, “মারের উপর কোন ঔষধ নাই।” লামা উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর শুক্কুর কমেন্টে লিখেন, “নির্দিষ্ট কবে একজনের নাম বলতে পারবেন কি ? ইনবক্সে লিখুন অর্থের অংক সহকারে, গুপনীয়তা রক্ষা করা হবে।” তার প্রশ্নের জবাবে এক ইউপি সচিব বাবু স্বরুপ লিখেন “স্যার, হারাধন বাবু যাকে আমরা হারাইয়া ধন বলে জানি, এক সময় হারাইয়া ধন ছিল, এখনো যদি ওনি থাকে তাহলে তো কথাই নাই! প্রতিত্তোরে তহিদুল ইসলাম নামে আরেক শিক্ষক লিখেন, “উনার কর্তা আরো খারাপ। সিনিয়র সিটিজেনকেও সম্মান করেনা।”

পলাশ সৌরভ বড়ুয়া নামে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কমেন্টে অভিযোগ করেন, “জানুয়ারি/২০২০ এ ১,৯২০০০ টাকা জিপিএফ লোন নিলাম ব্যাংক লোন পরিশোধ করব বলে। লোন পাস করার পর দাদা বাবু চা খাইতে ৫০০ টাকা চাইল। ৫০টাকা দেওয়াতে চরম গোস্সা করল!!!! অবশ্য ৫০ই নিল।” অং সাই মার্মা নামে একজন লিখেন, “হিসাবরক্ষণ অফিসে বিল লাগাতে গেলেই ৫%-৮% কমিশন দিতে হয় আর কমিশনের টাকা যায় অডিটরের পকেটে। আর এখন তো জুন মাস ওদেরতো ঈদ” হিসাবরক্ষণ অফিসের অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মচারীর সন্তান মোঃ আব্দুল করিম বলেন, “আমার বাবা এত্র অফিস থেকে অবসর নিলেও অবসর কালিন টাকা এবং আব্বুর মৃত্যুর পরবর্তী আম্মুুর নামে পেনশন চালু করতে অনেক ইচ্ছাকৃত ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।”

এইসব বিষয়ে কথা হয় উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা কাজী আনিছুল ফিরদাউস এর সাথে। তিনি বলেন, সবাই কাজ করেন আমার অডিটরদের সাথে। তারা কারো কাছ থেকে ঘুষ চাইলে তারা আমাকে কেন অভিযোগ করেনা ? কিছু লেনদেন হয় সেটা অস্বীকার করব না।

লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর-এ জান্নাত রুমি বলেন, দেখি হিসাবরক্ষণ অফিসারকে ডেকে এই বিষয়ে জানব। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মতামত দিন