লামায় একজনের মাতৃত্বকালীন ভাতা অন্যজনের নামে উত্তোলন!

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, নিজস্ব সংবাদদাতা, লামা:
লামায় অসহায় দরিদ্র মা’দের মাতৃত্বকালীন ভাতা বিতরণে চরম অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। ভুয়া তালিকা করে একজনের নামের টাকা অন্য মহিলাকে দিয়ে তোলা হচ্ছে। গত ১৮ জুন ২০২০ইং বৃহস্পতিবার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের ৪জন ভুয়া মহিলা দিয়ে লামা সোনালী ব্যাংক হতে ৭ হাজার ২শত টাকা করে উত্তোলন করে তাদের ১২শত টাকা করে দিয়ে বাকী ৬ হাজার টাকা দফাদার জয়নাল ও গ্রাম পুলিশ সাহাব উদ্দিন রেখে দেয়ার অভিযোগ করেছে টাকা উত্তোলনকারী মহিলা মিনু আরা বেগম, জনু আরা, সুফিয়া খাতুন ও বেবী আক্তার। টাকা আত্মসাৎ এই ঘটনার সাথে ইউপি চেয়ারম্যান, সচিব, ইউপি মেম্বার, ব্যাংক কর্মকর্তা ও মহিলা বিষয়ক অফিসের লোকজন জড়িত থাকতে পারে বলে তারা জানায়।

লামা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার অফিস সূত্রে জানা যায়, লামা পৌরসভায় ৪৫০ জন ও ৭টি ইউনিয়নের ১৪৫ জন করে মোট ১০১৫ জন সহ সর্বমোট ১ হাজার ৪৬৫ জন দরিদ্র অসহায় মহিলা মাতৃত্বকালীন ভাতা পায়। তারা প্রতিমাসে ৮শত টাকা করে তিন বছর (৩৬ মাস) এই ভাতা পাবে। কখনো ৬ মাস কখনো ৯ মাসের টাকা ভাতাভোগীদের একসাথে দেয়া হয়। মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিতে ২০ বছরের বেশি বয়সী দরিদ্র নারীদেরই মাতৃত্বকালীন ভাতা দেয় সরকার। এছাড়া যাদের বসত ভিটা ছাড়া আর কোনো জমি নেই আর যাদের মাসিক আয় দেড় হাজার টাকার নিচে এমন নারীরা এ ভাতা পাওয়ার যোগ্য। ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য, পরিবার পরিকল্পনাকর্মীসহ ৮ সদস্যের কমিটির মাধ্যমে ভাতা পাওয়ার যোগ্য নারী নির্বাচনের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, জনপ্রতিনিধিরা তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের ভাতা দিচ্ছেন। ফলে বহু নারী এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার অনেকে এ কর্মসূচির কথাই জানেন না।

অভিযোগ উঠেছে, অসহায় ও দুস্থ নারীদের এ ভাতা দেওয়ার কথা থাকলেও ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে স্বচ্ছল, জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয়-স্বজন, এমনকি অবিবাহিত নারীদের নাম ও ছবি, ভুয়া বিয়ের কাবীন নামা এবং তাদের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার জাল সনদ ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করা সত্ত্বে অনেক নারী বলেন, তালিকা যাচাই করলে অনেক ভুয়া নাম উঠে আসবে। সংশ্লিষ্টরা ভুয়া নাম দিয়ে একজনের নামের টাকা অন্য জন দিয়ে তুলে আত্মসাৎ করছে। প্রতিজন ভাতা ভোগীর নামে আলাদা ব্যাংক একাউন্ট থাকলেও ব্যাংক হিসাবে কম্পিউটারে তাদের ছবি ডাটা এন্ট্রি না হওয়া ও চেকের পরিবর্তে মাষ্টাররোলে টাকা উত্তোলনের কারণে একজনের টাকা অন্যজন তোলার সুযোগ পাচ্ছে বলে জানায় ভুয়া পরিচয়ে টাকা উত্তোলন করেছে এমন কয়েকজন নারী।

অন্যজনের নামে টাকা তুলেছেন এমন একজন নারী উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের হায়দারনাশী এলাকার মোঃ সবুজের স্ত্রী মিনু আরা বেগম। তিনি বলেন, আমাকে বলা হয়েছে আমার নামে ঘর দেয়া হবে। সেই প্রকল্পের টাকা তুলতে হবে বলে গ্রাম পুলিশ সাহাব উদ্দিন আমাকে সহ আরো ৩ জন নারীকে লামা সোনালী ব্যাংকে নিয়ে যায়। ব্যাংকে গিয়ে সে আমাকে টাকা তুলার সময় আমার নাম “মোবারকা” বলতে বলে এবং আমি ব্যাংকে মোবারকা নামে স্বাক্ষর করি। আমরা ৪ জন মহিলা অন্য নামে স্বাক্ষর করে ৭ হাজার ২ শত টাকা করে ব্যাংক হতে উত্তোলন করি। টাকা নিয়ে ব্যাংক হতে বের হলে দফাদার জয়নাল ও গ্রাম পুলিশ সাহাব উদ্দিন সবার টাকা নিয়ে ফেলে। আমাদের নগদ ১ হাজার টাকা ও ভাত খাওয়ার জন্য ২শত টাকা করে দিয়ে ৪ জনের বাকী ৬ হাজার করে ২৪ হাজার টাকা নিয়ে যায়। জনু আরার পুরো টাকা নিয়ে ফেলা হয়েছে। আমরা চেয়ারম্যান, সচিব ও মেম্বারকে অবহিত করে কোন প্রতিকার পায়নি। আমরা বাকী টাকা চাইলে দফাদার ও গ্রাম পুলিশ বলে, এই টাকা হতে ব্যাংকের অফিসার, মহিলা বিষয়ক অফিসের লোকজন ও জনপ্রতিনিধিদের দিতে হবে। গত তিন বছর যাবৎ এইভাবে ভুয়া মহিলা দিয়ে তারা মাতৃত্বকালীন ভাতার টাকা তুলে আত্মসাৎ করছে।

এই বিষয়ে গ্রাম পুলিশ সাহাব উদ্দিন বলেন, আমি টাকা নেয়নি। টাকা নিয়েছে দফাদার জয়নাল। কিন্তু মহিলারা জানায় তাদের হাত থেকে টাকা সাহাব উদ্দিন কেড়ে নেয়। দফাদার জয়নাল বলেন, ভাই নিউজ করিয়েন না, আপনার সাথে যোগাযোগ করব !

ফাঁসিয়াখালী ইউপি সচিব মোঃ শহিদ হোসেন বলেন, বিষয়টি আমরা শুনেছি। ত্রানের চাল বিতরণ করার কারণে এখনো কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ফাঁসিয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান জাকের হোসেন মজুমদার বলেন, জয়নাল ও সাহাব উদ্দিনকে টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া সচিবকে তাদের দুইজনের নামে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে বলা হয়েছে। দোষী প্রমাণীত হলে তাদের বহিষ্কার করতে উর্দ্ধতন কর্মকর্তার কাছে লেখা হবে।

এই বিষয়ে লামা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা (অ:দা:) ও জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আতিয়া চৌধুরী বলেন, এই ভাতা ২ বছর দেয়ার কথা ছিল। পরে ১ বছর বাড়ানো হয়েছে। পরের এক বছরের বাড়ানোর বিষয়টা হয়ত ভাতাভোগীরা জানে না। সেই টাকাটা অন্য মহিলা দিয়ে তুলে আত্মসাৎ করতে পারে বলে আমার ধারনা। আর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ভাতাভোগীদের নামে চেক বই ইস্যু না করে মাষ্টাররোলে টাকা দেয়ার কারণে এই সুযোগ নিচ্ছে দুষ্কৃতিকারীরা। আমাদের লোকবল সংকট থাকায় সঠিক মনিটরিং করাও সম্ভব হচ্ছেনা।

মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর-এ জান্নাত রুমি বলেন, অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মতামত দিন