কালুরঘাট ব্রীজ সংস্কারের নামে কি হচ্ছে এসব?

সৈয়দ মোঃ নজরুলইসলাম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা প্রতিনিধিঃ

ঘটনাটি গত শুক্রবারের , ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত প্রায় ১১ টা ছুঁই-ছুঁই। কালুরঘাট ব্রীজের পশ্চিম পাড়ে বেশ কয়েকজন পরিশ্রান্ত মানুষের জটলা, বুঝা গেল পূর্বপাড়ে পার হওয়ার জন্য অপেক্ষায় আছেন এরা সবাই । তারা জানেন সংস্কার কাজের জন্য এ সময়টুকুতে কালুরঘাট ব্রীজটি বন্ধ থাকার কথা রয়েছে। তাই তারা গাড়ি করে এখান পর্যন্ত এসেছিলেন। এদের মধ্যে আবার কয়েকজন কারখানা শ্রমিক টাইপের নারীও রয়েছে। এমন সময়ে হঠাৎ কানে ভেসে আসলো এক সি এন জি টেম্পু চালকের হাঁক-ডাক- “ওবা গেলে আইয়ু ব্রীজ খোলা আছে, ওডা নামা ২০ টিয়া” সাবই হুড়মুড়িয়ে উঠে গেল । আমরা যে কজন উঠতে পারিনি অগত্যা পায়ে হেটে ব্রীজ পার হতে গিয়ে জানতে চেষ্টা করলাম সংস্কারের ১০ দিনের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫ দিন তো কেটে গেছে এ ৫ দিনে কতটুক কাজ হয়েছে,না পুরো ব্রীজজুড়ে দৃশ্যমান কোন কাজ আমাদের চোখে পড়ল না। সঙ্গীয় রফিক নামের বহদ্দারহাট কাঁচা বাজারের এক তরকারী বিক্রেতাকে বলতে শুনা গেল আমিতো প্রতিদিন এ সময়ে ব্রীজ পাড় হয়ে বাড়ী যাই, প্রতিদিন রাত ১১ টার দিকেই কোন সময়তো কাজ করতে দেখিনি তাদের । সংবাদকর্মী ফারুক ইসলাম বলেন- আমি অফিস ছুটি শেষে প্রতিদিন রাত সাড়ে ১০/ ১১ টার দিকে নিজের বাইক নিয়ে বাড়ি ফিরি প্রথমদিন একটু খানি টুংটাং করতে দেখেছিলাম কয়েকজনকে, এ কয়দিনে তাদের কোন কাজ-কর্ম তেমন আর চোখে পড়েনি। আসলে এগুলো হল ভাওতাবাজি, লুটপাটের প্রক্রিয়া । শুধু- শুধু মানুষকে কষ্ট দেয়া ছাড়া অন্য কিছু নয়,। তিনি বলেন প্রয়োজন না হলে জনগুরুত্বপূর্ণ ব্রীজটি শুধু-শুধু বন্ধের ঘোষনা দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির কোন দরকার ছিল না রেলওয়ের।

ব্রীজের পূর্বপাড়ে এসে কথা হয় রেলওয়ে গেইটম্যান মাহাবুর সাথে। তিনি জানান প্রথম দিন ব্রীজ বন্ধ রেখে কয়েকঘন্টা কাজ করেছিল ,এরপর থেকে বাইরে এসে বাকীকাজ দিনের বেলায় সেরে নিচ্ছেন তারা। সুতরাং আপাতত ব্রীজ বন্ধ রাখার প্রয়োজন হচ্ছেনা।

সংস্কারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ বি কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী অনিমেশ করের ০১৭১১৭৯৯৪৭৫ নম্বরের মুঠোফোনে বাব-বার ফোন দিয়ে তিনি রিসিভ না করায় যোগাযোগ করা সম্ভব না হলেও আকতার হোসেন বাবুল নামের তার এক প্রতিনিধি বলেন- কাজ চলছে না কথাটি ঠিক নয়, গত ১৩ জুলাই থেকে এখানে ১২/১৩ জন শ্রমিক এক নাগাড়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে প্রয়োজন না হওয়ায় আমরা আপাতত ব্রীজ বন্ধ না করে বাইরে থেকে দিনের বেলায় স্লীপার জোরানোর কিছু কাজ সেরে নিচ্ছি। তাই চোখে পড়ছেনা। যোগানের এসব কাজ শেষ হয়ে গেলে আজ কালের মধ্যে ব্রীজ বন্ধ রেখে তা স্হাপনের কাজ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তারা তাদের কাজ শেষ করতে পারবে বলে জানান তিনি।
গত ১৩ জুলাই থেকে চলে আসা দ্বিতীয় দফা এ সংস্কার কাজ আগামী ২ ৩ জুলাই পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। এর আগে এ বছরের ১৪ জানুয়ারী থেকে ২৩ জানুয়ারী পর্যন্ত ১০ দিন বন্ধ রেখে ৫২ লাখ টাকার এ কাজের প্রথম দফা সংস্কার কাজ চালিয়েছিল রেল কর্তৃপক্ষ।

তবে দীর্ঘ ১৫/১৬ বছর পর সংস্কারের উদ্যোগ নেয়ায় ব্রীজ ব্যবহারকারীদের মাঝে সন্তোষ দেখা গেলেও কাজের মান ও বরাদ্দ নিয়ে অসন্তোষ বিরাজ করতে দেখা গেছে অনেকের মাঝে।আবদুল মালেক নামের এক সি এন জি চালক বলেন -এগিন কাজ গড়েতদ্দে না হিতারা, নাকি টশা গড়েতদ্দে, একটু লিপি পুছি দিয়েনে যারগোই। মফিজুর রহমান নামের স্হানিয় চরণদ্বীপের এক বাসিন্ধার অভিযোগ- নিরাপত্তা ব্লক গুলোর কি করুণ অবস্হা দেখেন, সব নষ্ট। যারা পায়ে হেটে পার হয় তাদের নিরাপত্তার জন্য আগে এগুলো পরিবর্তন দরকার। কালুরঘাট সেতু বাস্হবায়ন পরিষদের আহবায়ক মোঃ আবদুল মোমিন। যিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন এখানে নতুন সেতু বাস্হবায়ন নিয়ে। তিনি বলেন- আমাদের দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে আমরা এখানে ইতোমধ্যে নতুন একটি সেতুর ঘোষনা পেয়েছি সরকার থেকে। এটি দৃশ্যমান করার লক্ষে আমাদের এলাকার সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মোছলেম উদ্দিন সাহেব ও খুবই আন্তরিক। নির্বাচনের সময় আগামী ডিসেম্বরের আগেই এটির দৃশ্যমান করবেন বলে তাঁর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি থাকলেও বৈশ্বিক করোনা মহামারীতে আবারো পিছিয়ে যায় এটি । অবস্হাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হতে তো কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। অন্তত ততদিন পুরানো এ ব্রীজটি সচল রাখতে হবে। এটির এখন যে অবস্হা তাতে আগের চেয়ে আরো বড় ধরণের সং।স্কারের প্রয়োজন ছিল। এখন লোক দেখানো যে কাজ চলছে তাতে এটি আরো অধিক জরাজীর্ণ হয়ে যে কোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন রেল কর্তৃপক্ষ কোনমতেই দায় এড়াতে পারবেনা। আমরা এ নিয়ে স্হানিয় জনপ্রতিনিধিদের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

জানাযায়- ১৯৩০ সালে নির্মিত একমুখি এ ব্রীজটির মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় ২০০১ সালে রেল কর্তৃপক্ষ এরপর ২০১১ সালে চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) একদল গবেষকও এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা দেয়। এমতাবস্হায় ২০০৪ সালে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে বড় ধরনের সংস্কার কাজের মাধ্যমে সচল রাখা হয় মেয়াদোত্তীর্ণ এ ব্রীজটি । এ সময় ১১ মাস ব্রীজের ওপর যানবাহন চলাচল বন্ধ রেখে নিচে ফেরি চলাচলের ব্যবস্হা করে সংস্কার কাজ করা হয়েছিল। এ ছাড়াও গত ২০১৮ সালে জাহাজের ধাক্কায় ব্রীজের একটি স্প্যান সরে গেলে ওই সময় দুদিন বন্ধ রেখে তা ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে মেরামত করা হয়েছিল। এরপর এ কয় বছর উল্লেখযোগ্য আর কোন সংস্কার কাজ চালানো হয়নি এখানে। অথচ অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় ব্রীজের বর্তমান অবস্হা অত্যান্ত শোচনীয় বলে জানান এলাকাবাসি । এমতাবস্হায়মেয়াদোত্তীর্ণ ৯০ বছর বয়সী এই ব্রীজের ওপর দিয়ে ঝুঁকি ও ভোগান্তি মাথায় নিয়ে দৈনিক প্রায় ১ লাখের ও বেশি লোক চলাচল করে আসছে। বোয়ালখালী ও পটিয়ার বেশ কিছু অংশের প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই ব্রীজের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল।
তাছাড়া ব্রীজটি দিয়ে প্রতিদিন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত দুবার করে যাওয়া–আসা করে।

মতামত দিন