মাস্ক পরছে না মানুষ !

ড. নিজামউদ্দিন জামিঃ

মাস্ক পরার কারণে পৃথিবীতে একটি মানুষও মারা গেছে-এমন খবর এখনো দেয়নি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। কিন্তু টালবাহানা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। এটা আমাদের জাতিগত দুর্ভাগ্য যে, আমরা মাস্ক পরছি না। মানুষ না মানছে রাষ্ট্রের কথা, না মানছে ধর্মের কথা। আর আমার মতো অধমের কথা নাই বা বললাম! মহামারিকালে মানুষের করণীয় সম্পর্কে বিভিন্নধর্মে স্পষ্ট নির্দেশনা আছে। ধর্মের লেবাসধারীরা সেকথাও মানতে নারাজ। তাই ওদের ভণ্ড বলি, ধার্মিক নয়।

আত্মহত্যার আলামত
——————————
যে বা যারা স্বাস্থ্যবিধি মানে না, তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা স্পষ্ট ও প্রবল। জীবন সৃষ্টিকর্তার নিয়ামত ও আমানত। জীবনকে পরিচর্যা করা আর সৃষ্টিকর্তার প্রতি আনুগত্য দেখানোর মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। সৃষ্টিকর্তার আমানত যে বা যারা খেয়ানত করে, সে নিশ্চয়ই আত্মহত্যাকারী, নাফারমান বান্দা। আত্মহত্যা কোনো ধর্মই সমর্থন করে না। মাস্ক না-পরা আর আত্মহত্যা করা একই কথা।

মাস্কপরা এখন ভদ্রতা
——————————
রাষ্ট্রের কথা বাদ দিলাম, ধর্মের কথাও বাদ দিলাম। ভদ্রতা বলতে, সামাজিকতা বলতে একটি চক্ষুলজ্জাতো আছে, বাঙালিদের মধ্যে সম্প্রতি তার অভাব প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।

৩-৪ কোটি মানুষের মুখে মাস্ক চাই
———————————–
১৬ কোটি মানুষের মুখে মাস্ক পরানোর দরকার হয় না। একচতুর্থাংশ মানুষের মুখে মাস্ক চাই। তাও আবার ঘরের বাইরে গেলে বিশেষত যেখানে জনসমাগম আছে, সেখানে মানুষের মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করার দরকার ছিল। সরকার পারতো সহজ কাজটি করতে কিন্তু কোনো করেনি, করছে না, আল্লাহ মালুম। সরকারের হাতে ক্ষমতা আছে, আইন রক্ষাকারী বাহিনী আছে। যারা জাতিসংঘের অধীনে বিভিন্ন দেশেও শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। কিন্তু নিজ দেশের অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি ! মাস্ক পরার উদাসীনতা আমাদের দারুণভাবে হতাশ করেছে। সরকার দায়ি করছে জনগণকে, ভদ্রসমাজ দায়ি করছে সরকারকে। তাঁদের প্রশ্ন- “কেন মাস্ক পরতে বাধ্য করা হচ্ছে না?”

কেবল মাস্ক পরে ৮০% সংক্রমণ কমানো সম্ভব
————————————–
করোনা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ এখন অনেক সুগম হয়েছে। শুধু মাস্ক পরে ৮০% সংক্রমণ কমানো যেত বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। সামাজিক দূরত্ব নাই বললেই চলে। মানুষ আর গরুর চলাচলের মধ্যে পার্থক্য হ্রাস পেয়েছে ইদানিং।

যারা বাঁচতে চায়, তাঁদের জন্য কী বিধান?
—————————————–
মানলাম, যারা মরতে চায়, তারা মরুক। কিন্তু যারা বাঁচতে চায়, তাঁদের জন্য কী বিধান? যারা করোনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে, তাঁদের প্রতি আমাদের সম্মান-সহানুভূতি তো দূরের কথা, উল্টো তারা সবজায়গায় হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছে। কিন্তু যারা স্বাস্থ্যবিধি মানছে না, তাদের কারণে সংক্রমিত হচ্ছেন ভালো মানুষগুলি। যাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা নাই বিন্দুমাত্রও। তাদের মৃত্যুর জন্য তাহলে কারা দায়ি? রাষ্ট্র নাকি বেপরোয়া নাগরিক? রাষ্ট্রের উচিত, যারা বাঁচতে চায়, তাদের বাঁচানো। এখন সবকিছু কেমন ঢিলেঢালা! “পার কর ডুবাইয়া মারো মহিমা তোমার”। এখন সবকিছু ভাগ্যের হাতে সোপর্দ করে আমরা যেন কর্তব্য শেষ করে ফেলেছি! মাথামোটা স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন বলেন- “অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে মৃত্যুহার অনেক কম।” তখন হাত-পা ওয়ালা পাগলা ঘোড়া লাফ দিয়ে উঠে ফের!

আইন রক্ষাবাহিনী কেন?
———————————
শহরের জনবহুল রাস্তা ও এলাকায় থানা আছে, পুলিশ ফাঁড়ি আছে কিন্তু কোনো পুলিশই কাউকে বলছে না- “মাস্ক পরুন!” সেনাবাহিনীর অনেক গাড়ি টহল দেয় কিন্তু মাস্ক পরতে বলা হয় না কাউকে। গাড়ির তেল পুড়ছে, পুড়ুক! মানুষ মরছে, মরুক! তাহলে কল্যাণ রাষ্ট্রের স্বপ্ন কি অধরাই থেকে যাবে?

সামাজিক সংগঠনগুলি চুপসে গেছে
————————————-
সামাজিক সংগঠনগুলিও কেমন জানি চুপসে গেছে! গর্ত থেকে বের হয়নি এখনো। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে যদি একটু মাইকিং করে বলতো- “ভাই! মাস্ক পরুন। নিজে বাঁচুন, অন্যকে বাঁচান” ইত্যাদি। কই বলছে নাতো! রাজনৈতিক সংগঠনের কথা বলার সাহস আমার এখনো হয়নি। তাই মুখে কুলুপ এঁটে দিলাম।

তাহলে বাঁচার উপায়?
—————————–
যারা মাস্ক পরে না, তারা ভাইরাস বহন করে নিজের বাসাবাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে। অসুস্থ মা-বাবা বা সন্তানের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে সেই মানুষগুলি।

গত ৭-৮ মাসে রাস্তায় একটি মানুষও পাইনি, যিনি মাস্ক না-পরা লোকের গাড়িতে উঠবেন না, মাস্ক না-পরা লোকের দোকান থেকে কিছু কিনবেন না, খাবেন না। নিজে বলে বলে গলা ফাটালাম কেবল। কেউ শুনলো না এ অভাজনের কথা। এখন এখন কোনো রিক্সাওয়ালাকে পাই না, যে মাস্ক পরে। তাহলে বাঁচবো কেমনে?

গাড়ির কোম্পানি যদি বলে দিতো যে, প্রত্যেক স্টাফকে মাস্ক পরতে হবে। মাস্ক ছাড়া কোনো যাত্রী গাড়িতে উঠতে পারবে না। সরকারও তা করতে পারতো, করেনি। সরকার ঘোষণা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে। “তদারকি” শব্দটির সাথে আমাদের সরকারগুলি কখনোই পরিচিত হয়নি, হবার লক্ষণও দেখি না। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের মালিক যদি মাস্কপরা বাধ্যতামূলক করতো, এতোদিনে বাংলাদেশের করোনা বিদায় নিতো। এতো মানুষও মরতো না। যে পরিবারে কেউ না কেউ মারা গেছে, সে পরিবারই জানে জীবন যন্ত্রণার অন্যরকম গল্প।

এ লেখাও বৃথা যাবে জানি। তবুও লিখলাম। কারণ আমি এদেশকে ভালোবাসি।
——————————–
ড. নিজামউদ্দিন জামি

মতামত দিন