বাকশাল গঠনের কারণ জানালেন প্রধানমন্ত্রী

বাকশাল গঠনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সংসদ নেতা বলেন, ‘তিনি যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলেন, তখন স্বাধীনতাবিরোধী চক্র, দেশীয়-আন্তর্জাতিক চক্র তার যাত্রাপথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করলো। দুর্ভিক্ষ ঘটিয়ে দেশের মানুষ হত্যা করলো। রাতের আঁধারে গণপরিষদ সদস্যদের হত্যা করতে শুরু করলো। ঈদের নামাজে পর্যন্ত সংসদ সদস্যকে হত্যা করা হলো। হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হত্যা করলো। পাটের গুদামে আগুন দেওয়াসহ থানা লুট করলো। আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি তৈরি হওয়াসহ নানা ধরনের ঘটনা। তার মধ্যে এ দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য দ্বিতীয় বিপ্লবের ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু, যার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে দ্রুত কীভাবে উন্নতি করবেন।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘একটি বিপ্লবের পর অনেক কিছুই ঘটে। যাদের অর্থ আছে, লাঠি আছে, তারা সবকিছু দখলে নিতে চায়। তাই যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কেউ যাতে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে না পারে, সত্যিকারের গণতান্ত্রিক অধিকার যেন জনগণের কাছে পৌঁছায়, সেজন্য একটি সিস্টেম চালু করতে চেয়েছিলেন। কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু তিনি শেষ করতে পারেননি।’

শেখ হাসিনা বলেন, “জাতীয় সংসদে তার (বঙ্গবন্ধু) যে ভাষণ, সে ২৫ শে জানুয়ারি ১৯৭৫ সেখানে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের দুর্নীতি, ঘুষ, চোরাকারবারি, মুনাফাখোরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং সংগ্রাম করতে হবে।’ মাননীয় স্পিকার, যে কথাগুলো তিনি বলেছিলেন, একবার চিন্তা করে দেখেন। পুরো জিনিসটাকেই কত উল্টো ব্যাখ্যা দিয়ে, যে একটা চমৎকার পদক্ষেপ তিনি নিলেন বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হবে, প্রতিটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হবে, সেটাকে নস্যাৎ করা হয়েছে।”

বাকশাল গঠনের কারণ ব্যাখ্যা করে সংসদ নেতা বলেন, ‘বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নটাই ছিল তার লক্ষ্য। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেছেন। কেবল এই বিষয়টি (বাকশাল) ভালোভাবে আসেনি। এটা নিয়ে অনেকে নানা ধরনের সমালোচনা করেন। বঙ্গবন্ধু যখন এই পদক্ষেপটা নেন, তখনও নানা ধরনের সমালোচনা শুরু হয়েছিল। তিনি একদলীয় শাসন ব্যবস্থা করেছেন—এটা করেছেন ওটা করেছেন, ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চান, নানা ধরনের কথা বলেছেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে সেই বিষয়ে কিছু বক্তব্য রাখতে চাই—জাতির পিতা যখন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করেন, সমগ্র জাতিকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেই তিনি দ্রুত জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। এদেশে উৎপাদন বৃদ্ধি করা, মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতি করা, এটাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এটা বাস্তবায়নের জন্য তিনি যে কাজগুলো করে গিয়েছিলেন, সেটার সমালোচনা এমনভাবে শুরু হয়ে গেলো যে, তারপর তো দুর্ভাগ্য যে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। যার কারণে তিনি এই কাজটি সম্পন্ন করে যেতে পারেননি। কিন্তু কী করতে চেয়েছিলেন সেটাই বড় কথা।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘নির্বাচনে যে টাকার খেলা বা অস্ত্রের খেলা বা মাসলের খেলা অথবা ১০টা হোন্ডা বা ২০ হোন্ডা, নির্বাচনটা সে রকম যেন না হয়, সত্যিকারের গণতান্ত্রিক অধিকার যেন মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেই সিস্টেমটা তিনি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা তো তিনি করতে পারেননি। সত্যি কথা বলতে গিয়ে ৭৫-এর পর যারা ক্ষমতা দখল করেছে তারা নির্বাচনে প্রহসন করে করে সিস্টেমটা নষ্ট করে দিয়েছে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি একটা সিস্টেমে নিয়ে আসতে।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ সম্মান নিয়ে চলুক সেটাই তিনি চেয়েছিলেন। তিনি কোঅপারেটিভের মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ করতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এতে তিন গুণ ফসল বেশি হবে। ৬৪ হাজার গ্রামকে তিনি কোঅপরারেটিভে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। এভাবে তিনি কৃষিকে আধুনিকায়ন করার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি প্রশাসনের আমূল পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এক জায়গায় এনে দেশের উন্নতির জন্য কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের তৃণমূল পর্যায়ে যাতে উন্নতি হয় সেটাই ছিল জাতির পিতার লক্ষ্য। এর জন্য তিনি ৫ বছরের কর্মসূচি নিয়েছিলেন। তিনি যদি সেটা বাস্তবায়ন করতে পারতেন তবে আজ বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নত দেশ হিসেবে থাকতো। কিন্তু তাকে সেটা করতে দেওয়া হয়নি। আসুন আমরা এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করি। জাতির পিতার স্বপ্ন সোনার বাংলা গড়ে তুলি।’

মতামত দিন