হারিয়ে যাচ্ছে ‘কালা বিন্নি’ ধান

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, নিজস্ব সংবাদদাতা, লামা:
এক সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি গ্রামে দেখা যেত ‘কালো বিন্নি’ ধানেরক্ষেত। যে বিলে বা মাঠে এই ধানের চাষ হতো, পুরো ওই এলাকা ধানের সুগন্ধে ম-ম করত। পার্বত্য অঞ্চলের এই ধানটি অনেক জনপ্রিয়। বিন্নি ধান রংয়ের বিবেচনায় সাধারণত তিন জাতের হয়ে থাকে। কালো, লাল ও সাদা। সবচেয়ে বেশী কদর ও দামী কালো বিন্নি ধানের। খাওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ের নৃ-গোষ্ঠী জনগণ তাদের বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে এই চালের ভাত পরিবেশন করতে দেখা যায়। এটি ‘কালো বিন্নি’ নামে পরিচিত হলেও অনেকে ‘পোড়া বিনি’ নামে চেনে।

কিন্তু গ্রামীণ কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে ঐতিহ্যবাহী এই ধানটি হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন পাহাড়ের নৃ-গোষ্ঠী জনগণ জুম চাষের মাঝে মাঝে স্বল্প পরিসরে এই ধানের চাষ করে থাকে।

সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় এর ক্যান্সার ও ডায়াবেটিস প্রতিরোধীসহ মূল্যবান ঔষধি গুণের তথ্য জানার পর বিশ্বব্যাপী কালো বিন্নির চাহিদা বাড়ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, অ্যান্থোসায়ানিন নামের একটি বিশেষ রাসায়নিক যৌগের কারণে এই ধানের চালের রং কালো হয়। আর অ্যান্থোসায়ানিন ক্যানসার ঠেকাতে বিশেষ ভূমিকা নেয়। তাছাড়া বার্ধক্য, স্নাযুরোগ, ডায়াবেটিস ও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ প্রতিরোধেও অ্যান্থোসায়ানিনের জুড়ি মেলা ভার। এই চালে আয়রন ও ফাইবার বেশি, অথচ শর্করা কম। শর্করা কম মানে ডায়াবেটিস রোগীর আদর্শ পথ্য। এ চালের গন্ধ গোবিন্দভোগের মতো।

লামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সানজিদা বিনতে সালাম বলেন, এক সময় এই এলাকায় প্রচুর পরিমাণে বিন্নি ধানের চাষ হতো বলে শুনেছি। এখন তিন পার্বত্য জেলার কোথাও কোথাও চাষ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। কিন্তু এখন লামা আলীকদম উপজেলায় এখনো এই ধান দেখা যায়। এ ধানের চাষ লাভজনক না হওয়ায় ধানটি হারিয়ে যেতে বসেছে। এই ধানটি এখনি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অচিরে ধানটি আমরা হারিয়ে ফেলবো।

লামা উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল বলেন, এখনো উপজাতি সংস্কৃতিতে এই ধান বা চালের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ধানটি বিলুপ্ত হওয়ার আগেই সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। ঐতিহ্যবাহী কালো বিন্নিকে আমরা হারিয়ে যেতে দিতে পারি না। এ ধানের চাষ ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন মনে করছেন সকলে।

লামা বাজারে ছোট নুনারবিল মার্মা পাড়ার বাসিন্দা থুয়ইচিং মার্মানী বিভিন্ন জুম চাষীদের কাছ থেকে এই বিন্নি ধান বা চাল সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। তিনি বলেন, নিজেদের খাওয়ার ও অতিথি আপ্যায়নের জন্য আমরা কালো বিন্নির চাষ করতাম। কিন্তু এখন করি না। ফলন কম হয় বলে বর্গাচাষিরাও এই ধানের চাষ করে না। যারা স্বল্প পরিসরে চাষ করে তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে আমি বিক্রি করি। প্রতি কেজি কালো বিন্নি চালের দাম ১০০ টাকা, লাল ও সাদা বিন্নি চাল প্রতি কোজি ৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়।

লামা বাজারের ব্যবসায়ী নেতা বেলাল আহমদ বলেন, কালো বিন্নি নতুন ধান কাটার পর কালা বিন্নি চাল দিয়ে নারকেলের পাটিসাপটা, পায়েসসহ নানা রকম পিঠা ও খাবার তৈরি করা হতো। এখন তা স্মৃতি। কালো বিন্নি নামে পরিচিত কালো এই চালের বহুমুখী উপকারিতা রয়েছে।

বিন্নি বা বিনি ধানের বিভিন্ন জাত রয়েছে। এর মধ্যে চন্দন বিন্নি, গেং গেং বিন্নি, মৌ বিন্নি, দুধ বিন্নি, রাঙা বিন্নি, আসানিয়া বিন্নি, ছৎছেৎ বিন্নি, বিজাবিরাং বিন্নি, কুৎচিয়া বিন্নি, আগুনিয়া বিন্নি, কাক্কুয়া বিন্নি, চিচাও বিন্নি, লেদার বিন্নি, লোবা বিন্নি, কবা বিন্নি, হরিণ বিন্নি, লক্ষণী বিন্নি, দরিমা বিন্নি, গারো বিন্নি ও কাঁশিয়া বিন্নি উল্লেখযোগ্য। তবে বর্তমানে বিন্নি চালের রং অনুসারে লাল বিন্নি, সাদা বিন্নি, কালো বিন্নি এই তিন ধরনের বিন্নি সুপরিচিত। বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাহাড়ি-বাঙালি সকলেই বিন্নি ধানকে বিন্নি ধান বলে। তবে আটালো জাতের ভাত ও কালো রঙের কারণে বৃহত্তর চট্টগ্রামে এই চালটি ‘কালা বিনি’ নামে পরিচিত হলেও এটি বিরুণ চাল বলে জানান কৃষিবিদরা।

কৃষিবিদদের মতে, কালো ধান আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। কালামানিক, কালিমুগা, কালাবিন্নি, কালি আমন, কাজলা, কালোজিরা, কাজলশাইল, কালা বালাম প্রভৃতি নামের প্রায় ৯০টির মতো জাতের কালো ধান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট চিহ্নিত করেছে। তবে সুগন্ধ ও স্বাদের কারণে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে উৎপাদিত কালো বিন্নির চাহিদা আলাদা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রেজাউল করিম সাংবাদিককে জানান, প্রতি ১০০ গ্রাম কালো চালের ভাতে সাধারণ চালের তুলনায় আমিষের পরিমাণ প্রায় ৮.৫ গ্রাম বেশি। জিংকের পরিমাণও বেশি। কালো চাল ভিটামিন ‘ই’ সমৃদ্ধ। এটি চোখ, ত্বক ও দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। কালো চালের ভাত শরীরের বিষাক্ত বর্জ্য ও লিভারের ক্ষতিকারক পদার্থগুলো দূর করতে সক্ষম। কালো চাল শরীরে বিদ্যমান শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুবই জরুরি।
কথিত আছে, চতুর্দশ-সপ্তদশ শতকে মিং যুগের চিনে এর চাষ হতো। কিন্তু রাজা ও রাজ পরিবারের সদস্যরা ছাড়া কালো ভাত মুখে তোলার অধিকার কারও ছিল না। কালো ধানের চাষ প্রজাদের জন্য ছিল নিষিদ্ধ। তাই এর আরেক নাম ফরবিডেন রাইস বা নিষিদ্ধ চাল। পরবর্তীতে এই চাল জাপান ও মিয়ানমারে ছড়িয়ে পড়ে। মিয়ানমার থেকে আসে বৃহত্তর চট্টগ্রামে। বর্তমানে বিশ্বে কালো চাল সমৃদ্ধ ২০০ ধানের জাত আছে। এর মধ্যে চীনের হাতেই আছে ৬০ শতাংশের বেশি। চীন ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত ও ফিলিপাইনে এ ধরনের ধান আবাদে চাষিদের আগ্রহ বাড়ছে।

মতামত দিন