দুই সাংসদ ও ডিসি এসপি’র পদত্যাগ দাবিতে ওবায়দুল কাদেরের ভাইয়ের অবস্থান

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী আবদুল কাদের মির্জা আচরণবিধি সংক্রান্ত সভা বর্জনের পর সড়ক অবরোধ করেছেন। রোববার (৩ জানুয়ারি) বেলা ১১টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সমর্থকদের নিয়ে তিনি উপজেলা সদরে মুজিব চত্বরে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেন। পরে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি খায়রুল আনম সেলিম ঘটনাস্থলে গিয়ে আব্দুল কাদের মির্জা ও তার অনুসারীদের অনুরোধ করলে তারা অবরোধ তুলে নেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

উপজেলা নির্বাচন কার্যালয় ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, ১৬ জানুয়ারি বসুরহাট পৌর নির্বাচন উপলক্ষে রোববার সকাল ১০টায় নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনবিষয়ক সভার আয়োজন করে উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ খোরশেদ আলম। সভায় জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিউল আলম সভাপতিত্ব করেন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আলমগীর হোসেন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউল হক মীর। সভায় মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিরসহ তিনজন প্রার্থী এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় উপস্থিত কয়েকজন বলেন, সভায় আবদুল কাদের মির্জা বক্তব্যের একপর্যায়ে কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিরুদ্ধে তার নির্বাচনী পোস্টার–ব্যানার ছিঁড়ে ফেলাসহ নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের নানা অভিযোগ করেন। এর নেপথ্যে ভাবির সঙ্গে তার পারিবারিক বিরোধ, দলের একাধিক সাংসদসহ কিছু নেতার ইন্ধন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। এই সময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম তাকে (আব্দুল কাদের মির্জা) নির্বাচনী আচরণবিধি নিয়ে কথা বলার অনুরোধ করেন। বক্তব্যের একপর্যায়ে জেলা প্রশাসক আর কিছু বলবেন কি না, জানতে চান। তখন আবদুল কাদের বক্তব্যে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেন, সভা থেকে বেরিয়ে আবদুল কাদের পৌর কার্যালয়ে গিয়ে দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। বেলা ১১টার দিকে তিনি পৌর শহরের জিরো পয়েন্টে বঙ্গবন্ধু চত্বরে অবস্থান নেন। সেখানে কয়েক হাজার নেতা-কর্মী ও সমর্থক হাজির হন। তারা টায়ার জ্বালিয়ে সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়ে ঝাড়ু নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এই সময় আবদুল কাদের মির্জা সেখানে শুয়ে পড়লে তার অনুসারীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করতে থাকেন।

জিরো পয়েন্টে সমাবেশে আবদুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন, কিন্তু ভোটের অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠা হয়নি। দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি বন্ধ হয়নি। তাই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে ভোট অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তিনি অবস্থান কর্মসূচিতে অনড় থাকবেন। কেউ পাশে না থাকলে প্রয়োজনে তিনি একা লড়ে যাবেন।

সমাবেশে আবদুল কাদের মির্জা নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নোয়াখালী-৪ আসনের এমপি একরামুল করিম চৌধুরী, তার স্ত্রী কবিরহাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শিউলী একরাম, তাদের ছেলে সাবাব চৌধুরী, ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম হাজারী এমপি, ফেনী পৌরসভার মেয়র প্রার্থী স্বপন মিয়াজী, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল, তার ভাগ্নে স্বাধীনতা ব্যাংকার্স পরিষদের সদস্য ফখরুল ইসলাম রাহাত, নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, পদচ্যুত এবং বরখাস্ত করা ছাড়া আমি বঙ্গবন্ধু চত্বরে অবস্থান ছাড়ব না বলে মাইকে ঘোষণা করেন।

আবদুল কাদের মির্জা নিজ ভাবির (আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের স্ত্রী) কথা উল্লেখ করেও উষ্মা প্রকাশ করেন।

সমাবেশে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি খিজির হায়াৎ খান, সাধারণ সম্পাদক নুরনবী চৌধুরী ও উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক আজম পাশা রুমেলসহ স্থানীয় নেতারাও বক্তব্য দেন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খিজির হায়াত খান বলেন, বিকেল পাঁচটার দিকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ এইচ এম খায়রুল আনম চৌধুরী বসুরহাট জিরো পয়েন্টে যান। তিনি আবদুল কাদের মির্জাকে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার পাশাপাশি জেলা কমিটি নিয়ে করা অভিযোগ নির্বাচনের পর বসে মীমাংসার আশ্বাস দেন। এরপর আবদুল কাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন। এরপর সড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন জানান, অবরোধ চলাকালে বিকালে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি খায়রুল আনম সেলিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে আব্দুল কাদের মির্জা ও তার অনুসারীদের অবরোধ তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদুর রহমান বেলায়েতের সঙ্গে আলোচনা করে মির্জার অভিযোগগুলোর বিষয়ে সমাধানের আশ্বাস দিলে বিকালে অবরোধ তুলে নিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

পুলিশ সুপার আরো বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত বিব্রতকর। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়েছে। সন্ধ্যায় জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির উপস্থিতিতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

জেলা প্রশাসক মো. খোরশেদ আলম খান বলেন, মেয়র প্রার্থী আবদুল কাদের মির্জা একটানা দীর্ঘক্ষণ নানা বিষয়ে বক্তব্য দেন। এর এক পর্যায়ে তাকে নির্বাচনী আচরণবিধি নিয়ে কিছু বলবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি রাগ করে সভাস্থল ত্যাগ করে বের হয়ে যান। এরপর তার উপস্থিতিতে তার অনুসারীরা প্রথমে উপজেলা পরিষদের সামনে এবং পরে সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরী বলেন, আব্দুল কাদের মির্জা কী কারণে আমাকে জড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন তা আমার জানা নেই। আমি দলীয় বিষয়ে কথা বলার জন্য দলীয় ফোরাম রয়েছে। তাই আমি বাইরে কাউকে নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

মতামত দিন