জননেতা ফজলুল হক বিএসসির ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক, তৎকালিন গণপরিষদের সদস্য, সর্বজন শ্রদ্ধেয় বর্ষীয়ান নেতা মরহুম সৈয়দ ফজলুল হক বি,এস,সি র ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। চট্টগ্রামের আওয়ামী রাজনীতির অন্যতম পুরোধা মিরসরাই আওয়ামী লীগের জনক জননেতা ফজলুল হক বিএসসির মৃত্যু বার্ষিকীতে এই মহান নেতার বিদেহী আত্মার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

মরহুম সৈয়দ ফজলুল হক বিএসসি ১ নভেম্বর, ১৯২৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তিনি যখন মাত্র ক্লাস ফাইভে পড়েন, তখন তাঁর পিতা সৈয়দ আহমেদ পরলোকগত হন। বাল্যকাল থেকেই সৈয়দ ফজলুল হক ছিলেন দৃঢ়চেতা, সাহসী, মেধাবী। সংসারে বিধবা মা, ভাই-বোনদের সঙ্গী করে জীবন-যুদ্ধে পদার্পণ করেন। প্রথম দিকে তিনি জায়গির থেকে মনের ভিতর সাহস ও একাগ্রতা নিয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যান। চিটাগাং কলেজ থেকে ইন্টার-মিডিয়েট পরীক্ষা কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করে, ’৪৮ সালে ঢাকায় আসেন। তাঁর সমগ্র শিক্ষাজীবন ছিল খুবই কৃতিত্বপূর্ণ।

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সিক্ত। তিনি আগাগোড়া ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ ছিলেন। সক্রিয় ছিলেন ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে। সান্নিধ্যে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুও তাঁকে বিএসসি বলে ডাকতেন। বহুবার একসঙ্গে জেল খেটেছেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজ হাতে লিখিত দিনলিপিতে তা লিখেছিলেন। (বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী : পৃষ্ঠা ১৬৮, ১৭৬)। রাজনীতিতে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তিনি পরপর দুবার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় হওয়ার কারণে প্রথমবারের মতো কারাগারে অন্তরিন হয়েছিলেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানে বিএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। তবে তাঁকে মুচলেকা দিতে হয়েছিল, পাস করার পর বিশ্ববিদ্যালয়মুখী হওয়া যাবে না। ’৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে গণপরিষদ ও জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর জনপ্রিয়তার কথা প্রখ্যাত লেখক ইমেরিটাস কিউরি, জাতীয় অধ্যাপক প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান তাঁর বই ‘কালনিরবধি’তে উল্লেখ করেছেন সাবলীলভাবে। (কালনিরবধি : পৃষ্ঠা ৪৮৭)। প্রয়াত নেতা সৈয়দ ফজলুল হক বিএসসি সবার কাছে সৎ রাজনীতিবিদ, দক্ষ সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহচর, সমাজহিতৈষী, বিদ্বান হিসেবে অত্যন্ত সুপরিচিত ছিলেন। এ ছাড়া ছিলেন বিদ্যানুরাগী।

প্রয়াত এই মহাপুরুষ ছিলেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। ছয় দফা আন্দোলনসহ দেশের নানা আন্দোলন সংগ্রামের অগ্রগামী সৈনিক বিএসসি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। অত্যন্ত মেধাবী, ত্যাগী, নির্লোভ এ ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল দৃষ্টান্ত। পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে ওপারে গেছেন ২২ বছর।

জননন্দিত এই নেতা জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৮ সালের ১ নভেম্বর। তাঁর পিতা সৈয়দ আহাম্মদ মিয়ামমারের রেঙ্গুনে চাকরি করতেন এবং মা হোসনে আরা বেগম ছিলেন গৃহিণী। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। মিরসরাইয়ের আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪৬ সালে তিনি মেট্টিক পাশ করেন। ১৯৪৮ সালে এইচএসসি পাশ করেন চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হওয়ার কারণে পাকিস্তান সরকার তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক করে। সেখানে বসেই তিনি বিএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেন।

তিনি ছিলেন ৭২’র সংবিধান প্রনয়ণ কমিটির সদস্য। ৭২’এ গঠিত ত্রাণ কমিটির চেয়ারম্যান। ৭৫ পরবর্তী কারা নির্যাতিত নেতা।
মিরসরাই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
রাজনৈতিক কারণে ১৯৪৮, ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৮ ১৯৬৯, ১৯৭৭, ১৯৮২ সালে কারাবরণ করেন।
বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি ছিলেন।
নিজ এলাকায় ” মাজেদা হক উচ্চ বিদ্যালয় ” নামে স্কুল স্থাপন করেন।
বঙ্গবন্ধু পরিবারের সাথে ছিল তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক।
উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময় চট্টগ্রাম মহকুমা মুসলিম ছাত্র লীগের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।
৭০ সালে নির্বাচনকে ঘিরে মিরসরাই আওয়ামী লীগের নির্দেশনা যে ছনের ঘর থেকে হয়েছিল সেই ছনের ঘরটি এখন ফাঁকা ভিটে।
ছনের ঘরে টিন লাগাতে বললে তিনি বলেন- “মিরসরাইয়ে প্রতিটা ঘরে যেদিন টিন লাগবে সেদিন আমার ঘরেও টিন লাগাইস”।

১৯৯৯ সালে মৃত্যু বরণ করলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মিরপুর বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে দাফন করা হয়।

সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মতে, বিএসসি ছিলেন মিরসরাই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা। নির্লোভ এ রাজনীতিবিদ ইচ্ছে করলে অনেক কিছু করতে পারতেন। কিন্তু তিনি ভোগের রাজনীতি করেননি। সত্যিকারের সুষ্ঠুধারার রাজনীতি করেছেন। অর্থ-বিত্তেও সমৃদ্ধ ছিলেন না। কিন্তু রাজনীতিতে মেধার প্রয়োগ ঘটাতেন।

মতামত দিন