চসিকে কার গলায় বিজয়ের মালা?

স্টাফ রিপোর্টার: আজ বুধবার (২৭ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচন। সকাল ৮টা থেকে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে ভোটগ্রহণ শুরু হবে, যা বিরতিহীনভাবে চলবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত।

চসিক নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশের দৃষ্টি এখন বন্দরনগরী চট্টগ্রামের দিকে। কে হচ্ছেন চট্টগ্রাম সিটির ‘অভিভাবক’?। এই নির্বাচনে প্রায় ২০ লাখ ভোটার বেছে নেবেন তাদের ‘অভিভাবক’ মেয়র ও কাউন্সিলরদের।

নৌকা ও ধানের শীষের ভোটযুদ্ধের অপেক্ষায় নগরবাসী। মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় বাড়তি আগ্রহ সবারই। দলীয় প্রচারণায় মেয়রদের মতো পিছিয়ে ছিলেন না সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীরাও। সব প্রার্থীর প্রচারণায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল নগরীর অলিগলি।

গত কয়েকদিন ধরে চলছিল জমজমাট প্রচার-গণসংযোগ, ভোটারের দ্বারে দ্বারে প্রার্থীদের বিরামহীন ছোটাছুটি। দলের প্রার্থীর জন্য কর্মীদের দৌড়ঝাঁপ। চসিক নির্বাচন ঘিরে উৎসবে মেতে উঠেন প্রার্থী–ভোটাররা। তবে শঙ্কাও ছিল, এখনো আছে, শেষ পর্যন্ত ভোটটা সুষ্ঠুভাবে হবে তো। ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন তো।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ৭৩৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৪১০টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ভোটের তিন দিন আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা চট্টগ্রামে এসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করে চসিক নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

এদিকে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার সালেহ্ মোহাম্মদ তানভীর জানিয়েছেন, চসিক নির্বাচনে পুলিশ কঠোর অবস্থানে থাকবে। তিনি বলেন, ‘আমরা ডানেও তাকাবো না, বামেও তাকাবো না; যেই আইনশৃঙ্খলার জন্য থ্রেট হয়ে দাঁড়াবে তাকে কঠোরভাবে দমন করবো’।

তবে নির্বাচন কমিশন থেকে প্রশাসন কোনও আশ্বাসেই ভরসা নেই বিএনপির, এমনকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থীদেরও। বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের কারণে ভোটের দিনে সন্ত্রাসের আশঙ্কায় ভুগছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। অন্যদিকে ভোটকেন্দ্র দখলের আশঙ্কা করছে বিএনপি। তাদের ৫৬ জন এজেন্টকে ভোটের আগের দিন রাতে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি।

এদিকে নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। তিনি বলেছেন, এই নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার শঙ্কা ও উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

গত ১২ জানুয়ারি ২৮ নম্বর পাঠানটুলী ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুরের গণসংযোগে গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে আজগর আলী বাবুল (৫৫) নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী মারা যান। এ হত্যাকান্ডের পর নির্বাচনী মাঠ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এছাড়া গত ১৬ জানুয়ারি ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ডে নৌকার মেয়র প্রার্থীর গণসংযোগে আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয়পক্ষের ১৫ জন সমর্থক আহত হন। একই দিন নগরীর ২৫ নম্বর রামপুর ওয়ার্ডে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনের গাড়িবহরে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনার পর ভোটের মাঠে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

প্রার্থীদের টানা ১৮ দিনের প্রচারণা শেষ হয়েছে গত সোমবার মধ্যরাতে। এখন ভোটের ফল ঘরে তুলতে এখন নানা সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত প্রার্থীরা।

মেয়র প্রার্থী:
এদিকে নির্বাচনের দুই দিন আগে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী (হাতি) খোকন চৌধুরী ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন ভোটের দুই দিন আগে। ফলে এখন মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ ৬ দলের ৬ প্রার্থী ভোটযুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন। এরা হলেন-আওয়ামী লীগের (নৌকা) এম. রেজাউল করিম চৌধুরী, বিএনপির (ধানের শীষ) ডা. শাহাদাত হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের (হাতপাখা) মো. জান্নাতুল ইসলাম, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের (মোমবাতি) এম এ মতিন, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের (চেয়ার) মুহাম্মদ ওয়াহেদ মুরাদ এবং ন্যাশনাল পিপলস্ পার্টির (আম) আবুল মনজুর। মেয়র পদে ছয় জন প্রতিদ্বন্দ্বীতায় থাকলেও আওয়ামী লীগ-বিএনপি প্রার্থীর মধ্য থেকেই চট্টগ্রাম সিটির অভিভাবক নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন-এমনটি মনে করছেন সাধারণ ভোটারসহ সংশ্লিষ্টরা।

কাউন্সিলর প্রার্থী:
১৪ সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে প্রার্থী রয়েছেন ৫৭ জন। সাধারণ ৪১ ওয়ার্ডের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৩৯টি ওয়ার্ডে। প্রতিদ্বন্ধী না থাকায় ১৮নং পূর্ব বাকলিয়া ওয়ার্ডে হারুনুর রশিদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। আর ৩১ নং আলকরণ ওয়ার্ডে এক কাউন্সিলর প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। তবে ওই ওয়ার্ডে মেয়র ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ৩৯ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে লড়ছেন ১৬৮ জন প্রার্থী।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ৩১ নম্বর আলকরণ ও ১৮ নম্বর পূর্ব বাকলিয়া ওয়ার্ড ছাড়া বাকি ৩৯টি সাধারণ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী রয়েছে ১৬৮ জন।

৩৯টি সাধারণ ওয়ার্ড ও ১৪টি সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের মনোনীত ও বিদ্রোহী মিলে ৮৮ জন প্রার্থী রয়েছেন। ৩১টি সাধারণ ওয়ার্ডে ৬১ জন এবং ১২টি সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে ১৭ জন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। বাকি ৮টি সাধারণ ওয়ার্ড ও দুটি সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী রয়েছে।

বিএনপির মাত্র একটি সাধারণ ওয়ার্ড ও দুটি সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে।

ভোটার ও ভোট কেন্দ্র:
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে সাধারণ ওয়ার্ড ৪১টি ও সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ড ১৪টি। সিটিতে ভোটকেন্দ্র ৭৩৫টি। চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্যমতে, নগরীতে ভোটার সংখ্যা ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ৯২ হাজার ২৬ জন এবং নারী ভোটার ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৬৭৮ জন।

রেজাউল বহদ্দারহাট ও শাহাদাত বাকলিয়ায়:
আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী ভোট দিবেন বহদ্দারহাট এখলাছুর রহমান প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে। আর বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন ভোট দিবেন বাকলিয়া বিএড কলেজ ভোটকেন্দ্রে।

মতামত দিন