পৌনে ১৮ লাখ ইয়াবা নগদ পৌণে ২ কোটি টাকা নিয়ে কক্সবাজারে নারীসহ আটক ৫

মোঃ নূরুল হোসাইন,কক্সবাজারঃ

কক্সবাজার জেলা পুলিশের প্রশংসনীয় অভিযানে ইয়াবার বড় চালান উদ্ধার করেছে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ২ টার দিকে কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল-চৌফলদন্ডী ব্রিজের পাশে ভারুয়াখালী খালে নোঙর করা বোট থেকে ১৪ লাখ ইয়াবাসহ গ্রেফতার ফারুকের বাড়ি থেকে এক কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ নগদ টাকা (১৭ মিলিয়ন) জব্দ ও তাঁর চাচা শ্বশুর নুনিয়াছড়ার ছৈয়দ আলমের বাড়ি থেকে আরো ৩ লাখ ৭৫ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করেছে পুলিশ। সর্বমোট ইয়াবা ১৭ লাখ ৭৫ হাজার।

মঙ্গলবার (৯ ফেব্রুয়ারী) বেলা ২টার দিকে কক্সবাজারের পুলিশ সুপারের হাসানুজ্জামানের নেতৃত্বে চালানো অভিযানে ইয়াবার বৃহৎ চালান জব্দ করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী। এ ইয়াবা চালানের সাথে ট্রলার মালিকসহ দুজন পাচারকারী টাকা জব্দের সময় দুই জন্য ও পরে আবারও ইয়াবা উদ্ধারে গৃহকর্মী সহ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

প্রথমে গ্রেফতার করা হয় কক্সবাজার শহরের উত্তর নুনিয়ারছরা এলাকার মোজাফফরের ছেলে মোহাম্মদ বাবু (৫৫), একই এলাকার নজরুল ইসলামের ছেলে ও সাবেক মহিলা মেম্বার রাজিয়া বেগম রাজুর ছেলে এবং পৌর যুবদলের সাংগঠনিক কথোপকথনের জহিরুল ইসলাম ফারুক (৩৭)কে। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ফারুকের স্বীকারোক্তি মতে মাছ ধরার সরঞ্জাম রাখার গ্যারেজঘর থেকে দুই বস্তা টাকা উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম।

দুই বস্তা টাকা গুনে এক কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ টাকার হদিস মিলে বলে জানিয়েছেন উদ্ধারকারীরা। বেলা ৪টার থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কক্সবাজার পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে উত্তর নুনিয়ারছড়ায় সাবেক মহিলা মেম্বার রাজিয়া বেগম রাজুর বসতবাড়ির পার্শ্ববর্তী নয়নের খালি ভিটার টিনের গ্যারেজ থেকে এসব টাকা জব্দ হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মঙ্গলবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বেলা ২টার দিকে কক্সবাজারের পুলিশ সুপারের হাসানুজ্জামানের নেতৃত্বে কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল-চৌফলদন্ডী ব্রিজের পাশে ভারুয়াখালী খালে ডিবির চালানো অভিযানে সাত বস্তা ইয়াবার বৃহৎ চালান জব্দ করা সম্ভব হয়। এতে ১৪ লাখ ইয়াবা মিলে। এ ইয়াবা চালানের সাথে ট্রলার মালিকসহ দুজন পাচারকারীকেও গ্রেফতার করা হয়। তাদের স্বীকারোক্তি মতে সহযোগী হিসেবে আরও ২ জনকে আটক করা হয়।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন, ট্রলার মালিক কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছরা এলাকার নজরুল ইসলামের ছেলে জহিরুল ইসলাম ফারুক (৩৭), তার শ্বশুর আবুল কালাম (৫৫), শ্যালক শেখ আবদুল্লাহ (১৯) ও মোজাফফরের ছেলে মোহাম্মদ বাবু (৫৫)।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, গ্রেফতারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে উখিয়ার ইনানীর রেজুরখাল মোহনা থেকে ইয়াবার বিশাল এ চালানটি তারা গ্রহণ করে চৌফলদন্ডী ঘাটে এনে খালাসের অপেক্ষা করছিল। গোপন সংবাদে এটি খবর পেয়ে চৌফলদন্ডী ব্রিজ এলাকায় ভারুয়াখালী খালের সন্দেহজনক একটি ট্রলারে অভিযান চালায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। কাঠের বোট থেকে ইয়াবা ভর্তি সাতটি বস্তা উদ্ধার করা হয়। বস্তাগুলোতে ১৪০ কার্ড ইয়াবা পাওয়া গেছে। একটি কার্ডে ১০ হাজার হিসেবে সর্বমোট ১৪ লাখ ইয়াবা পাওয়া যায়।

এসপি বলেন, গ্রেফতারকৃত জহিরুল ইসলাম ফারুকের স্বীকারোক্তি মতে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজার পৌরসভার উত্তর নুনিয়ারছড়ায় অভিযান চালায় পুলিশ। এসময় ফারুকের বাসার লাগোয়া তার (ফারুকের) মামা নয়নের খালি ভিটার টিনের ঘরের মাটির নিচে বিশেষ কায়দায় বস্তা ভরে লুকিয়ে রাখা দু’বস্তা টাকা জব্দ করা হয়। বস্তা খুলে তা গুনে এক কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ টাকা এবং ফারুক ও তার স্ত্রীর নামে বিভিন্ন ব্যাংকের চেক, কয়েকটি দলিল পাওয়া যায়। এটি একটি অভাবনীয় ঘটনা। সে নিজেও জানেনা তাঁর কত টাকা আছে স্বীকারোক্তিতে তাঁর অবৈধ ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা লুকানো আছে স্বীকার করলেও জব্দ হয়েছে ১ কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ টাকা।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপারের হাসানুজ্জামান বলেন, বিশাল চালান উদ্ধারের আগে থেকেই পুলিশ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নতুন তালিকা করছে। পুরোনো তালিকার সাথে সামঞ্জস্য রেখে নতুন আরও ৮৮ জনের নাম এসেছে। আমরা ইয়াবা চক্রের সবাইকে নজরদারিতে রেখেছি। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। যেকোনো মূল্যে মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিরু টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা হবে। শুধু বহনকারী নয়, ইয়াবার উৎসমূল খুঁজে আইনের আওতায় আনা হবে। মঙ্গলবারের অভিযানের ঘটনায় মাদক ও অর্থ আইনে পৃথক মামলা করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনের পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে আবারও ইয়াবাসহ আটক ইয়াবা মাফিয়াখ্যাত জহিরুল ইসলাম ফারুকের চাচা শ্বশুর নুনিয়াছড়ার ছৈয়দ আলমের বাড়িতে অভিযান শুরু করে আরো ৩ লাখ ৭৫ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে সাড়ে ৯টায় উক্ত অভিযান সমাপ্ত হয়। অভিযানে ছৈয়দ হোসেনের গৃহকর্মী ছমিরা (২৩), স্বামী- সৈয়দ আলম কে আটক করা হয়। এ নিয়ে পাঁচ জনকে আটক করা হয়েছে।

উক্ত অভিযানে অংশ নেয়া কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম জানান, চৌফলদন্ডী ব্রীজ এলাকা থেকে ১৪ লাখ ইয়াবাসহ আটক জহিরুল ইসলাম ফারুকের চাচা শ্বশুর নুনিয়াছড়ার ছৈয়দ আলমের বাড়ি থেকে আরো ৩ লাখ ৭৫ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। দুটি বস্তাতে এসব ইয়াবা রক্ষিত অবস্থায় পাওয়া যায়।

তিনি আরো জানান, দুপুরে আটক জহিরুল ইসলাম ফারুকের দেয়া স্বীকারোক্তি মতে বিকাল ৫টার দিকে নুনিয়াছড়ার তার বাড়ি থেকে দুই বস্তাভর্তি এক কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। ওই সময় ফারুকের শ্বশুর ও এক শ্যালকে আটক করা হয়।

পুলিশ সুপার মোঃ হাসানুজ্জামান জানিয়েছেন, ১৪ লাখ ইয়াবাসহ আটক হওয়া জহিরুল ইসলাম ফারুককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে বাড়িতে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা রাখার কথা স্বীকার করেন তিনি। পরে দ্বিতীয় দফায় অভিযানে তার চাচা শ্বশুর ছৈয়দ আলমের বাড়িতেও বিপুল পরিমাণ ইয়াবা থাকার কথা স্বীকার করেন ফারুক। তার দেয়া তথ্য মতে, অভিযান চালিয়ে দুটি বস্তাভর্তি টাকা ও ইয়াবা উদ্ধার করা হয়

কক্সবাজার পৌরসভার স্থানীয় নারী কাউন্সিলর শাহেনা আকতার পাখি বলেন, ধৃতরা এলাকায় মৎস্য ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। সাগরে মাছ পাওয়া যাক আর না যাক তাদের ট্রলার সাগরে নিয়মিতই যাতায়াত করেছে। অন্যরা লোকসানে পড়লেও ফারুকের ট্রলারে কখনো লোকসান হয়েছে বলে শুনিনি। বরং তার ব্যবসা দিন দিন প্রসারিত হয়েছে। আজকের ১৪ লাখ ইয়াবা ও প্রায় দু’কোটি টাকা জব্দের পর খোলাসা হয়েছে কেন মাছ না পেলেও তার ট্রলারে লোকসান হয়নি। এটা আমাদের এলাকার (নুনিয়ারছড়া) জন্য চরম লজ্জার।

অভিযান ও সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সদর সার্কেল মামুন আল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সদর পঙ্কজ বড়ুয়া, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি শেখ মোহাম্মদ আলীসহ সকল কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।

মতামত দিন