প্রতিবাদী ফিলিস্তিনি কিশোরী গ্রেফতারে বিশ্বজুড়ে তোলপাড়

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: আদ তামিমি। দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে এক দুঃসাহসী অগ্নিকণ্ঠ প্রতিবাদী কিশোরী। নবী সালেহ গ্রামে ২০০১ সালে জন্ম। শৈশবেই নজর কাড়ে বিশ্ব গণমাধ্যমের। সশস্ত্র দখলদার ইসরাইলি সৈন্যদের সঙ্গে বারুদি ভাষায় তর্ক করে দৃষ্টি কাড়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার।

২০১২ সালে রামাল্লার পশ্চিমে নবী সালেহ গ্রামে বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রায় সৈন্যরা তার এবং তার মা নারিমান তামিমির ওপর হামলা করে। তার রক্ত চেহারার আগুনে প্রতিবাদী তর্কের দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ব গণমাধ্যমে।

ডিসেম্বরে চলতি সপ্তাহে ষোল বছরের কিশোরী আদ তামিমি আবার সংবাদের শিরোনাম হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে দুই সশস্ত্র সেনার গালে নিরস্ত্র এ কিশোরীর চপেটাঘাতের ভিডিওদৃশ্য। শুক্রবার তাদের বাড়িতে হানা দিয়ে তাকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে সে চড় বসিয়ে দেয় দখলদার দুই সৈন্যের গালে। বুধবার সকালে তাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় ইসরাইলি সৈন্যরা। বিরা এলাকার মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী সে।

কৈশোরে তার সহোদর মুহাম্মদকে গ্রেফতার করতে আসে ইসরাইলি কয়েক সেনা। তখন বাবার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে সেও চোখ রেখে প্রতিবাদ করে দখলদার বাহিনীর সঙ্গে। তার রক্ত চেহারার অকুতোভয় দ্রোহী প্রতিবাদের ধরন নজর কাড়ে বিশ্বমিডিয়ার। সে হয়ে ওঠে ফিলিস্তিনি তারুণ্যের কাছে দ্রোহ ও সাহসের প্রতীক।

মাত্র চার বছর বয়সে আদ পিতামাতার সঙ্গে শরিক হতো শুক্রবারের সাপ্তাহিক প্রতিবাদ মিছিলে। তার প্ল্যাকার্ডে লেখা থাকত : ‘তোমরা বেরিয়ে যাও আমাদের মাতৃভূমি থেকে, এটি তোমাদের ভূমি নয়’। সবসময় তার প্রত্যাশা সে আইন বিষয়ে পড়বে। বড় হয়ে আইনবিদ হিসেবে লড়বে স্বদেশ, স্বজাতি ও নিজ পরিবারের পক্ষে।

আদের বাবা বাসেম তামিমির জন্মও নবী সালেহ গ্রামে (১৯৬৭)। তিনি রামাল্লার বির যাইত বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতক এবং বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেন আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে। ১৯৮৮ সালে ইন্তিফাদার সময় দখলদার বাহিনী তাকে প্রথম গ্রেফতার করে। মুক্তি পাওয়ার পর ১৯৯৩ সালে আবার গ্রেফতার হন। মোট ৯ বার গ্রেফতার করা হয় তাকে। জায়নবাদী সেনাদের নির্যাতনে অবশ হয়ে পড়ে তার দেহের এক পাশ। পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয় এক পা ও এক হাত। ১৯৯৩ সালে বাসেমের বোন তার ছেলের বিচার চলাকালে ইসরাইলি মহিলা সৈন্যের আক্রমণে শহিদ হন।

আদের মা নারিমাল তামিমির জন্ম সৌদি আরবে ১৯৭৭ সালে। রামাল্লায় তিনি মাধ্যমিক পাশ করেন। দখলদার বাহিনী তাকে পাঁচবার গ্রেফতার করে। নবী সালেহ গ্রামে ইসরাইলি সৈন্যদের আক্রমণের চিত্র ক্যামেরাবন্দি করায় দখলদার সৈন্যরা তার ওপর হামলা করে। আদের নানা-নানী ছিলেন ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসরাইলের বসতি স্থাপন ও দেয়াল নির্মাণের বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধে আন্দোলনের সদস্য। ইন্তিফাদায় শহিদ হন আদের চাচা ও খালু। দখলদারদের অপরাধের চিত্র ও প্রমাণ সংগ্রহের জন্য তামিম পরিবারে একটি প্রেসই প্রতিষ্ঠা করা হয়। যা তামিমি প্রেস নামে বিখ্যাত।

জন্মের পর এই ষোল বছরে আদকে গ্রেফতারে ২০ বারের বেশি অভিযান চালায় দখলদাররা। সবশেষ গতকাল সকালে তাকে গ্রেফতার করে ইহুদি সেনারা। গ্রেফতারের আগে তারা বাড়ি থেকে কম্পিউটার ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয়। আদকে ছাড়িয়ে আনতে গেলে রামাল্লার উত্তরে বিনইয়ামিন শিবিরের সামনে থেকে তার মাকেও গ্রেফতার করে দখলদার বাহিনী। গ্রেফতারের আগে আদের গায়ে তিনটি রাবার বুলেট বিদ্ধ হয়। ভেঙে যায় তার হাত। যখন তাকে গ্রেফতার করে গাড়িতে তোলে তখনও সে অকুতোভয় ভঙ্গিতে দখলদার সৈন্যদের মুখে নিজের ও পরিবারের পক্ষে চিৎকার করে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে।

এর আগে ২০১২ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সিটি কর্পোশনের পক্ষ থেকে সাহসের জন্য তাকে ‘সাহসিকা হানজালা’ পুরস্কার দেয়া হয়। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী) রজব তৈয়ব এরদুগান ও তার স্ত্রী এমিলি তাকে নৈশভোজে দাওয়াত দিয়ে সম্মানিত করেন।

সূত্র : আল জাজিরা এরাবিক, আল আরাবিয়া এরাবিক

 

মতামত দিন