সরকারি মাতামুহুরী কলেজের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিদায় সংবর্ধনা

সরকারি মাতামুহুরী কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে কলেজের পক্ষ শুভেচ্ছা ক্রেস্ট তুলে দিচ্ছেন অতিথিরা।

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, লামা
“যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়”
বিদায়ে কেন এত বেদনা ? কেন এত কান্না, এত কষ্ট ? এত হাহাকার ? কেন কেন কেন ? বিদায় মানে কি তবে বিরহ ? বিদায়ের অন্য অর্থ কি তবে বিচ্ছেদ ? বিদায় মানে কি প্রিয় মানুষটিকে চিরতরে হারিয়ে ফেলা ? বিদায়ের ক্ষণটি সে জন্যই কি ব্যথাভরা ? সে জন্যই কি বিদায়বেলায় কারো ‘সজল করুণ নয়ন’ নত হয়ে থাকে বেদনায় ? কিন্তু আমরা যে চাই হাসিমুখে বিদায় নিতে। কারো চোখের পানিতে বিদায়ের পথটি ভিজে কর্দমাক্ত হয়ে উঠুক, তা যে চাই না। সে জন্যই কি আকুতি- ‘মোছ আঁখি, দুয়ার খোল, দাও বিদায়।’ সে জন্যই কি চোখে জল আর মুখে হাসি নিয়ে বলি- ‘শুভ বিদায়’ ?
হায়, এক জীবনে কত রকমের, কত ধরনের, কত বিচিত্র বিদায়ের ভার বহন করি আমরা! কখনো বিদায় দিই, কখনো বিদায় নিই। একটি বিদায় পেছনে ফেলে যায় কত প্রিয় মুখ, কত চেনা চেহারা! কত নীরব দৃষ্টি, কত কথা! কত হাসি-গান, কত স্মৃতি! বিদায়ের বেদনা কার বেশি? যে বিদায় নেয়, তার? নাকি যে বিদায় দেয়, তার? নাকি দু’পক্ষই সমান বেদনাভারে কাতর? একই দুঃখে দুঃখী হয়ে একই সমান কষ্ট পায় ?
বিদায়েরও কি তবে কিছু দায় থাকে ? বিদায়ে কি শেষ হয়ে যায় সব ? নাকি বিদায়ের পর শুরু হয় আরেক নবতর যাত্রা ? অনেক জিজ্ঞাসা, অনেক প্রশ্ন। সব প্রশ্নের উত্তর থাকে না। জীবনভর কত বিদায়ের ভেতর দিয়ে যেতে হয় আমাদের! শৈশবকে বিদায় দিয়ে কৈশোরে পৌঁছাই; কৈশোরকে বিদায় দিয়ে যৌবনে। যৌবন বিদায় হলে প্রৌঢ়ত্ব, আর প্রৌঢ়ত্বকে বিদায় জানিয়ে আসে বার্ধক্য। সবশেষে অনিবার্যভাবেই এই ইহজীবনকে বিদায় জানিয়ে না-দেখা কোনো অনন্ত জগতের পথে যাত্রা! যে জগৎ থেকে ফিরে এসে কেউ কখনো জানায়নি- কী আছে ওই পারে। ফলে ওই বিদায়ে সীমাহীন অনিশ্চয়তার ভয় থাকে। থাকে দ্বিধা, থাকে অনিচ্ছা। কিন্তু হায়! তবু নিতে হয় বিদায়। ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় অংশ নিতে হয় নিঃশেষ হবার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায়।
তাই তো কবির কন্ঠে ঠোঁট মিলিয়ে বলি ‘দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি, বেলা দ্বিপ্রহর, হেমন্তের রৌদ্র ক্রমে হতেছে প্রখর, জনশূন্য পল্লিপথে ধুলি উড়ে যায়, মধ্যাহ্ন বাতাসে … এ অনন্ত চরাচরে সবচে পুরাতন কথা, সবচেয়ে গভীর ক্রন্দন- যেতে নাহি দিব হায় তবু যেতে দিতে হয় তবু চলে যায়। ‘
অথচ অন্তরে তখন যেন শুনতে পাচ্ছিলাম কালের যাত্রার ধ্বনি। বুঝতে পারছিলাম, সেই ধাবমান কাল অন্যদের মতো আমাদের প্রিয় স্যারকে তার দ্রুত রথে উঠিয়ে নিয়েছে, পরিবর্তনের অনিবার্য স্রোতে নিজেকে এবার ভাসাতেই হবে। তাই ‘ফিরিবার পথ নাহি, দূর হতে যদি দেখ চাহি, পারিবে না চিনিতে আমায়, হে শিক্ষাগুরু বিদায়।’ বিদায়ের আরেক অর্থ প্রস্থান। বিদায়কালের চিরন্তন প্রশ্ন, ‘আবার কবে ফিরবে? আবার ফিরে আসবে তো?’ গাড়িয়াল তার পেছনে যে বধূকে রেখে যাচ্ছে, সেও কেঁদে কেঁদে বলছে, ওহে বন্ধু বিদায় যদি নেবেই তবে বলে যাও কবে আবার আসবে- ‘ওহো কি ও, বন্ধু কাজল ভ্রমরারে, কোনদিন আসিবেন বন্ধু, কয়া যাও, কয়া যাওরে…’
কারো ফেরার সময় হয়তো ঠিক করা থাকে। নির্ধারিত সময়ে কেউ কেউ ফিরেও আসে। কেউ কেউ আবার কোনোদিনও আসে না। আমাদের প্রচলিত সামাজিক সংস্কারে ছোট থেকেই শেখানো হয়েছে- ‘যাই’ বলতে নেই। বিদায়ও স্পষ্ট করে বলতে নেই। বলতে হবে ‘আসি’। সারাজীবন ঘরের বাইরে কোথাও যাওয়ার আগে তাই সব সময় বলেছি, ‘আসি।’ অর্থাৎ যাওয়ার আগেই ফিরে আসার এক ধরনের নিশ্চয়তা দিয়ে যাওয়া। তবু কি সব সময় ফেরা নিশ্চিত করা যায়? যায় না বলেই হয়তো আজম খান গান গেয়েছেন, ‘আসি আসি বলে তুমি আর এলে না।’
আজ মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম স্যারের বিদায়। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অনেকে দেখলাম নীরব কান্না করতে। বিদায় কি শুধুই বিষাদের ? আনন্দের বিদায়ও কি নেই? নতুন স্বপ্ন, নতুন দায়িত্ব, নতুন রোমাঞ্চ। ফলে এই বিদায় বেদনার চেয়ে বেশি আনন্দের। দুঃখের চেয়ে বেশি সুখের। প্রিয়জনকে আমরা হয়তো কখনোই বিদায় দিতে চাই না। পারলে কলিজার ভেতর, অন্তরের গহিনে তাকে বেঁধে রাখি। কিন্তু চাইলেই কি তা পারা যায়? প্রিয় মানুষরাও তো জীবন শূন্য করে দিয়ে বিদায় নেয়। তাদের অভাবে আমাদের জীবন মুহূর্তের জন্য নীরব-নিথর, নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর বিদায় নেওয়ার বা বিদায় চাওয়ার সেই বিখ্যাত গানটা মনে আছে? ‘একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি/হাসি-হাসি পরবো ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী।’ শুকনো পাতা প্রাকৃতিকভাবেই বিদায় নেয় নতুন কিশলয়কে জায়গা করে দিতে। আবার সেই নতুন পাতাও এক সময় বিবর্ণ হয়, শুকিয়ে যায়, ঝরে পড়ে। তাই বিদায় মানেই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। একটা বিদায় হয়তো আরেকটি নতুন কিছুকে প্রতিস্থাপন করার জন্যই দরকারি। বিদায়ের দায় একটাই। সেটা হলো জায়গা ছেড়ে দেওয়া। পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। পেছনে কারো জলে ভরা চক্ষু থাকবেই। নিজের চোখও হয়তো ছল ছল করবে জলে; পা সরবে না সামনে, তবু যেতে হবে। কারণ বিদায় চিরন্তন, বিদায়-ই মৌলিক, সম্ভবত।
সরকারি মাতামুহুরী কলেজ, লামার সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম এর বিদায় সংবর্ধনা শনিবার (৬ মার্চ) বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত কলেজ মিলনায়তনে আয়োজন করা হয়। কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুজিবুর রহমান মানিকের সভাপতিত্বে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত আছেন, আলীকদম সেনা জোনের উপ-অধিনায়ক মেজর আলিফ মাহমুদ।
আরো উপস্থিত আছেন, লামা পৌরসভার মেয়র মোঃ জহিরুল ইসলাম, বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য শেখ মাহাবুবুর রহমান, কলেজের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক বাবু অংথিং, ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ জাহেদ উদ্দিন সহ প্রমূখ।
অনুষ্ঠানে কলেজের সকল প্রভাষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষার্থীরা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুজিবুর রহমান মানিক বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে এখন কলেজ বন্ধ। অন্যথায় আরো জাকজমাট করে বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করা হত।

মতামত দিন