কুলসুমের যাবজ্জীবন সাজার ঘাঁনি টানছেন মিনু!

’রমজান মাস আছিল। মর্জিনা আর কুলসুম আমারে কয়, তাগ লগে যাইতাম, ইছতারি নিয়া দিব। কুলসুম নাম ডাক দিলে আত তোলতাম। আমি তাগ লগে গেছি, নাম কইছে আত তুলছি। পরে হেরা আর কিছু দেয় না। লোআ দিয়া বানছে, লোয়ার খাচাত ভরছে। এহানে আমার বালা লাগে না, পোলা-মাইয়াগ লগে যামু, আঁরে লই যান।

সোমবার (২২ মার্চ) দুপুরে অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ ৪র্থ আদালত শরীফুল আলম ভূঁয়ার এজলাসে এভাবেই মেঠো বাংলায় বলছিলেন পঁয়ত্রিশোর্ধ মিনু বেগম ওরফে (মিনু পাগলী)। একটি হত্যা মামলার মূল আসামী কুলসুম আক্তার প্রকাশ কুলসুমির যাবজ্জীবন সাজা পরোয়ানা আসামীর পরিবর্তে কারাভোগ করছেন মিনু।

অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ ৪র্থ শরীফুল আলম ভূঁঞার আদালতে তিন শিশু সন্তানকে কাছে পেয়ে কুকিয়ে কেঁদে উঠেন মিনু। পাশে বসতে দেখাল, হাতের ইশারায়। কোলে তুলে নিল ছোট্ট জান্নাতকে। বলল-কেন আছচ। সেখানেই কথা হয় মিনুর সাথে। জানতে চাইলে অসহায়ের দৃষ্টিতে মিনু চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এরপর বলেন, রমজান মাস আছিল। মর্জিনা আর কুলসুম আমারে কয়, তারার লগে যাইমাত ইছতারি নিয়া দিব। কুলসুম নাম ডাক দিলে আত তোলতাম। আমি তাগ লগে গেছি, নাম কইছে আত তুলছি। পরে হেরা আর কিছু দেয় না। লোআ দিয়া বানছে, লোয়ার খাচাত ভরছে। এহানে আমার বালা লাগে না, পোলা-মাইয়াগ লগে যামু, আঁরে লই যান।

পিডাব্লিউ মূলে ওই কুলসুমি (মিনু)কে আদালতে হাজির করে কারা কর্তৃপক্ষ। আদালত মিনুকে তাঁর খাস কামরায় বিজ্ঞ আইনীজীবীর উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সেখানে ঘটনার বর্ণনা করেন মিনু।

এবিষয়ে শুনানীতে অংশ নেয়া এডভোকেট গোলাম মাওলা মুরাদ বলেন, বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হয়েছে। আদালত অতি মানবীয় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছেন। কিভাবে এ নারি একটি হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজা পরোয়ানাভুক্ত আসামী হিসেবে আদালতে আত্মসমর্পণ করলেন তা খতিয়ে দেখছেন। কারাগারে সংরক্ষিত রেজিষ্ট্রার তলব করা হয়েছে। বিষয়টি সার্বিক পর্যালোচনা করে পরবর্তী নির্দেশনা দিবেন আদালত, এমন বিশ্বাস এই আইনজীবীর।

মামলার নথি ঘেঁটে জানা গেছে, ২০০৬ সালের ২৯ এপ্রিলের রাত ৮টার ঘটনা। নগরীর কোতোয়ালী থানার রহমতগঞ্জ বাংলা কলেজ এলাকার ৮১নং গলির সাঈদ সাত্তারের ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন কুলসুম এবং পোশাক কর্মী কোহিনুর। চেরাগী পাহাড় মোড়ের এপোলো সুইয়িং গার্মেন্টেসে কাজ করতেন। গার্মেন্টস এর ডিউটি শেষ করে বাসায় এসে কোহিনুরের স্বামী জমির কুলসুমের মোবাইলে ফোন করে কোহিনুরের সাথে কথা বলেন। এই সূত্রধরে কুলসুম এবং কোহিনুরের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ হয়। পরবর্তীতে কোহিনুরকে ঘরের পেছনে আতা গাছের ডালে বাধা অবস্থায় উদ্ধার করে আত্মহত্যা বলে প্রচার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যায় কুলসুম। ওই সময়ে সিএমপির কোতোয়ালী থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা (নং-১৪, তাং-৩০/৫/০৬) রুজু করা হয়। তবে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর জানা যায়, বিষয়টি আত্মহত্যা নয়, বরং শ্বাসরোধে হত্যা। যে কারণে ওই অপমৃত্যু মামলাটি হত্যা মামলায় (৪৫৯/০৬) রূপান্তর করা হয়। মামলার বাদী হন কোহিনুরের পিতা আনোয়ারা থানার দেতলা গ্রামের নুরুল ইসলাম। ২০০৭ সালের ২৬ অক্টোবর একমাত্র আসামী কুলসুমকে আটক করে কোতোয়ালী থানা পুলিশ। এর এক বছর পর ২০০৯ সালের ১৮ জুন জামিনে মুক্তি লাভের পর লাপাত্তা হয়ে যান আসামী কুলসুম আক্তার প্রকাশ কুলসুমী। তখন রাষ্ট্রপক্ষে নিযুক্তীয় আইনজীবী ছিলেন মো. নোমান চৌধুরী। আর আসামী পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. বদরুল হক চৌধুরী।

মামলার দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়াশেষে ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর কুলসুমকে যাবজ্জীবন সাজা এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো এক বছরের সাজার রায় ঘোষণা করেন অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. নুরুল ইসলামের ৪র্থ আদালত। রায় ঘোষণার বছরখানেক পর ২০১৮ সালের ১২ জুন কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন মিনু বেগম প্রকাশ মিনু পাগলীকে কুলসুম সাজিয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করান কুলসুমের বিজ্ঞ আইনজীবী। সেদিন থেকে সোমবার (২২ মার্চ) পর্যন্ত ২ বছর ৯ মাস ১০ দিন নির্দোষ মিনু বেগম প্রকাশ মিনু পাগলী নামের ওই নারি কারান্তরীন আছেন।

মিনুদের বাড়ি বৃহত্তর নোয়াখালীতে হলেও নগরীর আমিন জুট মিল এলাকায় দুই ভাইবোনের জন্ম এবং বেড়ে উঠা। পরে বসতি গাঁড়েন ছিন্নমূলের লোকমানের খামার এলাকায়। তার মায়ের নাম সালেহা বেগম। বছর ৭ আগে তার বাবা মো. সোলেমান মারা যান। আর মিনু গ্রেফতারের বছর দেড়েক পর মিনুর মাও চলে যান এ পৃথিবী ছেড়ে। এসময় মিনুর তিন সন্তান মো. ইয়াছিন(১০), মো. গোলাপ(৬), জান্নাত(৪)র শেষ আশ্রয়স্থল হারিয়ে যায়। পরে মানবিকতার হাত বাড়ায় এলাকার দুই প্রতিবেশি। ৪ বছরের ছোট্ট জান্নাতকে নিয়ে লালন-পালন করছেন শাহাদাত নামের এক ব্যক্তি। স্থানীয় একটি এতিমখানার পরিচালক মো. রাসেল হোসেন তার মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেন ৬ বছরের গোলাপকে। আর ইয়াছিন ষোলশহর রেলস্টেশনের পাশে একটি চায়ের দোকানে কাজ করেন। তাকে দেখভাল করেন তার দিনমজুর মামা মো. রুবেল হোসেন।

এদিকে কুলসুম বেগম প্রকাশ কুলসুমি কারাগারে যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন। তিনি ন্যায় বিচার বঞ্চিত হয়েছেন উল্লেখ করে রায় প্রকাশের ৪শ দিন পর ২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল উচ্চ আদালতে আপীল (৪২৯৩/১৯) দায়ের করেন ইকবাল হোসেন নামের এক আইনজীবী। আর পুরো আপীল প্রক্রিয়া দেখভাল করেন চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সদস্য এডভোকেট মো. নাসির উদ্দিন। তিনি জামালখান ওয়ার্ড ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। এ প্রতিবেদক কথা বলেন তার সাথে। মামলার বিষয়টি ওঠতেই অবলিলায় বলেন-ভাই আমি শুধু আপীল বিষয়ে কাজ করেছি। আসামী আত্মসমর্পণ কিভাবে, কার মাধ্যমে করেছে আমি কিছুই জানিনা। মামলার নথি দেখলে সবকিছু পাবেন উল্লেখ করে এই আইনজীবী বলেন, তারা একটি বস্তিতে থাকত, আসামীর ভাইয়ের সাথে আমার জুনিয়রের পরিচয়সূত্রে আমার কাছে আসে। তারা আসার সময় মামলার সকল সার্টিফাইড কপি নিয়ে এসেছে। ইকবাল হোসেন নামে হাইকোর্টের এক আইনজীবীর মাধ্যমে আমি শুধু আপীল ফাইল করিয়েছি। এর বেশি কিছুই জানেন না বলে দাবী করেন তিনি।

যোগাযোগ করা হলে আপীল দায়েরকারী আইনজীবী মো. ইকবাল হোসেন বলেন, চট্টগ্রামের নাসির নামে এক আইনজীবী তাকে দিয়ে হাইকোর্টে এ আপীল করিয়েছেন। লকডাউনের কারনে যোগাযোগ ব্যাঘাত ঘটায় তিনি (নাসির) এখন আমার কাছে থেকে মামলা নিয়ে গেছেন। অন্য কেউ দেখছেন হয়তো। আপীলটি শুনানি হয়েছে উল্লেখ করে এই বিজ্ঞ আইনজীবী বলেন, আদালত বলেছে, পেপার বুক আকারে উপস্থাপন করতে হবে। তারপর বিবেচনা করা হবে. দেখা হবে।

সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘ অনুসন্ধানশেষে কারান্তরীন সেই মিনুর সাথে সাক্ষাতের আবেদন করেন প্রতিবেদক। সেই সূত্রে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. শফিকুল ইসলাম খান বিষয়টি অতি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন, চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। এরপর তিনি অতি অমানবিক স্পর্শকাতর বিষয়টি আদালতকে অবহিত করেন। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ (৪র্থ) আদালত সিনিয়র জেল সুপারের আবেদন মঞ্জুর করে কুলসুমকে (মিনু পাগলী) আদালতে হাজির করতে পি/ডাব্লিউ ইস্যু করেন। আজ সোমবার (২২ মার্চ) কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয় মিনুকে। খবর পেয়ে আদালতে ছুটে আসে মিনুর তিন শিশু সন্তান, এক ভাই। দুই প্রতিবেশী। যাদের আশ্রয়ে আছে মিনুর তিন শিশু সন্তান। নয়াবাংলা।

মতামত দিন