সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়: চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাত দিনের সর্বাত্মক লকডাউন

ভারত সীমান্তবর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনাভাইরাসে দৈনিক শনাক্তের হার ছিল ১০ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে। তবে গত কয়েকদিনে তা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। গতকাল সোমবার এ জেলায় নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ছিল ৫৫ শতাংশ। পাশের জেলা রাজশাহীতেও ছিল ৪৫ শতাংশ। করোনা মহামারিতে এক দিনে দৃশ্যত এত বেশি শনাক্তের হার এর আগে দেশের কোথাও দেখা যায়নি। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ১০ জন করোনা রোগী।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর মতোই সীমান্তবর্তী আরও কয়েকটি জেলায়ও করোনার উচ্চ সংক্রমণ হার দেখা গেছে। যেমন যশোরে গতকাল শনাক্তের হার ছিল ২১ দশমিক ২৭ শতাংশ। সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থা দেখা গেছে দিনাজপুর, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা, সিলেট ও মৌলভীবাজারে। অথচ সারাদেশে গত চব্বিশ ঘণ্টায় গড় শনাক্তের হার ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। এ সময় রাজধানী ঢাকায়ও শনাক্তের হার ছিল ৯.১৫ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সীমান্ত জেলাগুলোতে নতুন করে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। সারাদেশে করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ভারতের সঙ্গে সীমান্ত এলাকাগুলোতে গত কয়েকদিন ধরে আক্রান্তের হার হু-হু করে বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সীমান্ত জেলাগুলোতে জোরালো সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসন কর্তৃপক্ষের ধারণা, করোনার ভারতীয় নতুন ধরনের কারণে সীমান্ত এলাকাগুলোতে সংক্রমণ বাড়ছে। সীমান্ত জেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাত দিনের সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। আজ মঙ্গলবার থেকে আগামী ৩০ মে পর্যন্ত এ লকডাউন চলবে।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত, একটি কিংবা দুটি জেলা নয়, সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়া সব সীমান্ত জেলায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। ওই জেলার মানুষ যাতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে না পারে তা জোরালোভাবে তদারকি করতে হবে। যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
অবশ্য সীমান্ত জেলাগুলোতে করোনার ভারতীয় নতুন ধরন ছড়িয়ে পড়েছে কিনা সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র ও সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, ভারতে শনাক্ত হওয়া করোনার নতুন ধরনে আক্রান্ত ৯ জন এ পর্যন্ত দেশে শনাক্ত হয়েছে। সন্দেহভাজন আক্রান্ত আরও কয়েকজনের শরীর থেকে নমুনা নিয়ে জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কাজ চলছে। এটির ফলাফল এলে তখন আক্রান্তের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে জানা যাবে।
ডা. নাজমুল বলেন, করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরনের সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেশি। এ কারণে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। অর্থাৎ সঠিকভাবে মাস্ক পরা, হাত জীবাণুমুক্ত করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করা- এ বিষয়গুলো অবশ্যই পালন করতে হবে। তাহলেই অনেকাংশে সংক্রমণমুক্ত থাকা সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কয়েকদিন ধরে ভারত সীমান্তে অবস্থিত কয়েকটি জেলায় সংক্রমণ বাড়ছে। গত এক সপ্তাহের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সর্বোচ্চ আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে এক সপ্তাহে এ জেলায় গড় শনাক্তের হার ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ। এরপর পর্যায়ক্রমে খুলনায় এক সপ্তাহে গড় শনাক্তের হার ২৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ, রাজশাহীতে ২২ দশমিক ৭৪ শতাংশ, মৌলভীবাজারে ২০ শতাংশ, মেহেরপুরে ১৮ দশমিক ৮১ শতাংশ, দিনাজপুরে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ, সাতক্ষীরায় ১৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, সিলেটে ১৪ শতাংশ, যশোরে ১৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং কক্সবাজারে ১২ দশমিক ৮৩ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ সময় সারাদেশে গড় শনাক্তের হার ছিল ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ। আর রাজধানী ঢাকায় শনাক্তের হার ৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জনই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার। তবে সরকারি সীদ্ধান্তের ফলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশ করছে ভারতে আটকে পড়া বাংলাদেশিরা।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ২৫০ শয্যার হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে ১৯ জন করোনা রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। বর্তমানে জেলায় করোনা রোগী চিকিৎসাধীন ২৫৯ জন। জেলায় এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ২৭৫ জনের শরীরে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আর ১ হাজার ২০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এবং মারা গেছেন ২৭ জন। ভারত থেকে সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করেছেন মোট ৬৯ জন। এর মধ্যে একজনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে। ভারত থেকে আগতদের জেলা শহরের একটি আবাসিক হোটেল এবং সোনামসজিদ ডাকবাংলোতে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে।

এদিকে গতকাল সোমবার জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ লকডাউনের ঘোষণা দেন। লকডাউন চলাকালে জরুরি পরিষেবা ছাড়া সব যানবাহন ও ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে। সোনামসজিদ স্থলবন্দরকে লকডাউনের আওতামুক্ত রেখে পণ্য পরিবহন সচল রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও জেলার আম পরিবহনের জন্য পরিবহনকারী ট্রাকগুলো লকডাউনের আওতামুক্ত এবং আমের আড়তগুলোর আয়তন বৃদ্ধি করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়। আগামী সাত দিন বাইরের জেলা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে কোনো পরিবহন ঢুকতে পারবে না এবং জেলা থেকে অন্য কোথাও যেতে পারবে না। অর্থাৎ আন্তঃজেলা পরিবহন বন্ধ থাকবে।

জেলা প্রশাসক বলেন, লকডাউন চলাকালে সব রকম দোকানপাট ও সাপ্তাহিক হাট বন্ধ থাকবে। তবে কাঁচাবাজার, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও ফার্মেসি খোলা থাকবে। কেউ জরুরি প্রয়োজনে বাইরে গেলে অব্যশই মাস্ক পরিধান করে যেতে হবে। জুমাসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ২০ জনের বেশি অংশ নিতে পারবেন না। শিল্প-কারখানার শ্রমিকরা নিজস্ব পরিবহনে যাতায়াত করবেন। এ ছাড়া জরুরি পরিষেবা- কৃষি উপকরণ, খাদ্যশস্য পরিবহন, কভিড টিকা, ত্রাণ বিতরণ, গণমাধ্যমকর্মী, ইন্টারনেট লাইন সংযোগ সংশ্নিষ্টরা লকডাউনের আওতার বাইরে থাকবেন। জেলা প্রশাসক সবাইকে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানান।

মতামত দিন