হত্যা মামলায় কারাভোগী মিনুকে মুক্তির নির্দেশ

সন্তানদের ভরণপোষণের আশায় এক অভাবী মা স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেছেন। খুনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির বদলে তিন বছর ধরে জেল খাটছেন তিনি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় তদন্তে বেরিয়ে আসে অমানবিক গল্প।

সোমবার (৭ জুন) বদলি জেল খাটা চট্টগ্রামের নিরাপরাধ মিনুকে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, এটি বিচারব্যবস্থার সঙ্গে ঘৃণ্যতম প্রতারণা। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে।

চতুর এক নারী আসামির প্রলোভনের ফাঁদে পড়েন দুই সন্তানের জননী চট্টগ্রামের মিনু। দ্রুত মুক্ত করা এবং সন্তানদের ভরণপোষণের শর্তে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত কুলসুমীর বদলে জেলে যান তিনি। এরপর থেকে তিন বছর ধরে জেলে মিনু। এ সময়ে ভরণপোষণতো মেলেনি উল্টো দীর্ঘায়িত হয় তার কারাবাস। তখনই হুঁশ হয় তার। বিষয়টি কারা কর্তৃপক্ষকে জানালে তদন্ত হয়। আদালতের তদন্তে বেরিয়ে আসে পুরো ঘটনা।

অবশেষে সেই খুনের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কুলসুম আক্তার ওরফে কুলসুমীর বদলে কারাভোগ করা নিরাপরাধ মিনুকে দ্রুত মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামি কুলসুমীকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়া হয়।

বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের (ভার্চুয়াল) বেঞ্চ শুনানি শেষে সোমবার এই আদেশ দেয়।

পাশাপাশি এই ঘটনায় চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি এম এ নাসের, দুই আইনজীবী নুরুল আনোয়ার ও বিবেকানন্দ চৌধুরী এবং আইনজীবী সহকারি সৌরভকে আগামী ২৮ জুন হাইকোর্ট হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

আদালতে মিনুর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শিশির মুনির ও ইকবাল হোসেন। আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. মো. বশির উলল্গাহ।

তিনি বলেন, দীর্ঘ দিন চতুর কুলসুম মিনুকে আশা দিয়েছিল তার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সেটা না করায় বিষয়টি জেলারকে জানানো হলে তদন্ত হয়। তদন্তে পুরো ঘটনাটি বের হয়ে আসে। গত দুই বছরে এ রকম ২৬টি বদলি জেল খাটার নজির রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

আলোচিত এই ঘটনার বর্ণনায় আইনজীবী শিশির মনির জানান, ২০০৬ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জ বাংলা কলেজ এলাকায় কোহিনুর আক্তার ওরফে বেবী নামের এক নারী খুন হন। ওই ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা হয়। একপর্যায়ে এই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্তার অভিযোগে কুলসুম আক্তার ওরফে কুলসুমীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর ২০০৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কুলসুমীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০০৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কুলসুমী জামিনে মুক্ত হন। তবে ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত রায়ে কুলসুমীকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। রায়ের দিন অনুপস্থিত থাকায় আদালত তার বিরুদ্ধে সাজাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

পরে ২০১৮ সালের ১২ জুন মিনু নামের এক মহিলাকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি কুলসুম আক্তার ওরফে কুলসুমী সাজিয়ে আত্মসমর্পণ পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর ২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল কুলসুমী হাইকোর্টে আপিল করেন।

২০২১ সালের ২১ মার্চ চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে চিঠি দিয়ে জানান যে, ২০১৮ সালের ১২ জুন তারিখে কারাগারে পাঠানো আসামি প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামি কুলসুম আক্তার নয়। এরপর কারাগারে থাকা আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। আসামি আদালতে জবানবন্দিতে জানায় যে, তার নাম মিনু। মর্জিনা নামের এক মহিলা তাকে চাল-ডাল দেবে বলে জেলে ঢোকায়। প্রকৃত আসাসি কুলসুম আক্তারকে সে চিনে না। এরপর আদালত কারাগারের রেজিষ্ট্রার দেখে হাজতী আসামি কুলসুমী এবং সাজাভোগকারী আসামির চেহারায় অমিল খুঁজে পান। এরপর চট্টগ্রামের আদালত কারাগারের রেজিষ্ট্রারসহ মামলার যাবতীয় নথি হাইকোর্টে পাঠায়।

 

মতামত দিন