প্রতি বছরে বার কাউন্সিলের পরীক্ষা নিশ্চিত নেবোই; সম্ভব হলে দুটি-অ্যাটর্নি জেনারেল (ভিডিও)


দেশের ১৬তম অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। বর্ষীয়ান এ আইন বিশেষজ্ঞ বিচার অঙ্গনের বার কাউন্সিলের পরীক্ষা নিয়মিতকরণ, আইনজীবীদের সুরক্ষা আইন প্রণয়ন সহ সমসাময়িক নানা ইস্যূতে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন ইত্তেফাক অনলাইনের সঙ্গে। বার কাউন্সিলের নিয়মিত পরীক্ষা নেয়ার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ও এডহক বার কাউন্সিলের বর্তমান চেয়ারম্যান এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, আপনারা নিশ্চিত থাকেন এখন থেকে প্রতি বছর একটি করে পরীক্ষা নেবই আর সম্ভব হলে বছরে দুটি পরীক্ষা নেয়া হবে।

সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো-

ইত্তেফাক: করোনার এই মহামারিতে বিচার বিভাগের সঙ্গে জড়িত পেশাজীবীদের জীবন-জীবিকা কেমন চলছে?

অ্যাটর্নি জেনারেল : করোনায় দেশের সব পেশার মানুষের মতো আইন বিভাগও বিপর্যস্ত। আইনজীবীরা জীবিকা নির্বাহের জন্য আদালতের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু তারা আদালতে যেতে পারছেন না। মামলা মোকদ্দমার শুনানি করতে পারছেন না। এতে আইনজীবীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। উচ্চ আদালতে ভার্চুয়ালি শুনানি করা সম্ভব হলেও নিম্ন আদালতে তা সম্ভব হয়নি।

ইত্তেফাক: আপনি সুপ্রিম কোর্টের সভাপতি পদের পাশাপাশি অ্যাটর্নি জেনারেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করছেন। একই সঙ্গে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কিভাবে সামলাচ্ছেন?

অ্যাটর্নি জেনারেল: আইনজীবী হিসেবে আমার প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে আইন পেশা পরিচালনা করা। তাই সুপ্রিম কোর্ট বারেও আইন পেশা পরিচালনা করি। সরকারি আইনজীবী হিসেবেও করছি। আগে করতাম সাধারণ মানুষের পক্ষে, এখন সরকারের আইনগত বিষয়টা দেখি সরকারের পক্ষে। ফলে একসঙ্গে দুটো করতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

ইত্তেফাক: একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের দক্ষ, যোগ্য ও কর্মঠ হিসেবে গড়ে তুলতে আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে কী?

অ্যাটর্নি জেনারেল: ইতো:পূর্বে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আইনজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালু ছিল। যা আপাতত বন্ধ আছে। আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করবো এই ট্রেনিং আবার চালু করতে। পাশাপাশি বিজ্ঞ বিচারক, অভিজ্ঞ আইনজীবী, ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলসহ সবার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আইনজীবী ও শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের দক্ষ করার লক্ষে একটি মেলবন্ধন তৈরির চেষ্টা করছি। আর একবিংশ শতাব্দীতে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রথাগত আইনের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত বিষয়ে ব্যাপকভাবে ধারণা থাকতে হবে।

ইত্তেফাক: আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত এবং বার কাউন্সিল বিধি অনুযায়ী ৬ মাস অন্তর অন্তত একটি পরীক্ষা গ্রহণ করার কথা থাকলেও তা বিভিন্ন কারণে সম্ভব হচ্ছে না। নিয়মিত পরীক্ষা না হওয়ায় আইনঙ্গনের ইমেজ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে অভিযোগ। এ ব্যাপারে আপনার পরিকল্পনা কী ?

অ্যাটর্নি জেনারেল: বিগত কয়েক বছরে করোনাসহ নানা কারণে পরীক্ষা হয়নি। পূর্বে পরীক্ষার বিষয়ে মামলা-মোকদ্দমাও হয়েছিল। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এবার পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম, কিন্তু বেশ ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় পাঁচটি কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীরা গণ্ডগোল করলো। পরে ওই পাঁচটি কেন্দ্রে আবার পরীক্ষা নিয়ে রেজাল্ট দেওয়া হয়েছে। চলমান বিধি নিষেধের বিষয়টি বিবেচনা সাপেক্ষে আগস্টে ভাইভা নিতে পারবো বলে আশা করছি।

তিনি বলেন, আপনারা নিশ্চিত থাকেন এখন থেকে প্রতি বছর একটি করে পরীক্ষা নেবই আর সম্ভব হলে বছরে দুটি পরীক্ষা নেয়া হবে।

ইত্তেফাক: অনেক আইন কলেজ অধিক মুনাফার লোভে অনুমোদনের তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করান। এতে শিক্ষার মান কতটা বজায় রাখা সম্ভব বলে মনে করেন?

অ্যাটর্নি জেনারেল: সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বলা হয়েছিল কোনো বিশ্ববিদ্যালয় একই সেমিস্টারে ৫০-এর বেশি ছাত্রছাত্রী ভর্তি নিতে পারবে না। কিন্তু অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন মানেনি। অতিরিক্ত ছাত্রছাত্রী ভর্তি করলে অনেক সময় সঠিকভাবে পাঠদান সম্ভব হয় না। এতে শিক্ষার মান বজায় থাকে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা ও অধিক মুনাফার জন্য এটা করে। আমি চেষ্টা করছি এই সমস্যা গুলো দ্রুত সমাধান করার।

ইত্তেফাক: বিজ্ঞ আইনজীবীদের অনেকেই মনে করেন আপনার নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ অনেকাংশে সফল। আপনি দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ভুল বা অনুশোচনা হয়েছে কী?

অ্যাটর্নি জেনারেল: হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ভুল থাকবে। কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তবু চেষ্টা করেছি স্ব-জ্ঞানে কোনো ভুল না করতে। ২০১৯ সালে যখন সুপ্রিম কোর্ট বারে প্রথম নির্বাচন করি তখন আমার নির্বাচনী ইশতেহার ছিল, সুপ্রিম কোর্টের পরিবেশ পরিবর্তনের চেষ্টা করা। আমি কোর্টের বাহ্যিক পরিবেশের পরিবর্তন এনেছি, মূল ভবনের কাজ ৭০-৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে গেছে। তবে আমি মনে করি- এসব আমার একার কৃতিত্ব নয়, আমার সঙ্গে কমিটির সহ-সম্পাদক শামসুল আহসান শুভ এবং চঞ্চল কুমার বিশ্বাসসহ যারা রয়েছেন প্রত্যেকের আন্তরিক সহযোগিতায় সম্ভব হয়েছে।

ইত্তেফাক: আইনজীবীরা অন্যের আইনি সুরক্ষায় কাজ করেন, কিন্তু তাদের নিজের সুরক্ষায় কোনো আইন নেই। বিভিন্ন সময় আইনজীবীরা সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ আছে কি ?

অ্যাটর্নি জেনারেল: এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। একজন আইন বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই আইনজীবীরা কাজ করেন। সেই কাজ করতে গিয়ে যদি কেউ প্রভাবশালীদের রোষের শিকার হোন, সেক্ষেত্রে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। তবে আইনজীবীদের সুরক্ষার জন্য আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। আশা করছি খুবই শিগগিরই সেটা করতে পারবো।

ইত্তেফাক: করোনাকালে আইনজীবীদের প্রণোদনা, জীবদ্দশায় বেনাভোলেন্ড ফান্ডের আর্থিক সহযোগিতা পাওয়ার যৌক্তিকতা বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?

অ্যাটর্নি জেনারেল: করোনাকালে গত বছর সুপ্রিম কোর্ট বারে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় সুদবিহীন ঋণ প্রদান করি। এবারও দেওয়া হয়েছে। একজন আইনজীবীর পক্ষে এই করোনাকালীন দুই বছরে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা খুব কাজে আসবে না। আইনমন্ত্রী (আনিসুল হক) জানিয়েছেন, প্রণোদনার চেষ্টা চলছে। আশা করছি অচিরেই পাবে।

ইত্তেফাক: বার কাউন্সিল ও বিচারঙ্গনের ডিজিটালাইজেশনের ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?

অ্যাটর্নি জেনারেল: সরকার ই-জুডিশিয়ারির জন্য প্রজেক্ট নিয়েছে। ইতিমধ্যে বার কাউন্সিল অনেকখানি ডিজিটালাইজড হয়ে গেছে। বাকিটা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সহযোগিতায় এগিয়ে নিয়ে যাব, ইনশাআল্লাহ।

ইত্তেফাক: নবীন আইনজীবীরা এই পেশায় কিভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন?

অ্যাটর্নি জেনারেল: নবীন আইনজীবী বন্ধুদের অনুরোধ করবো- এই পেশায় মানুষের সেবা করার মানসিকতা নিয়ে আসবেন। শুধু টাকা রোজগারের জন্য হলে আইনজীবী না হয়ে ব্যবসায়ী হবেন। আইনজীবী পেশাকে গুরুমুখী শিক্ষা বলা হয়। গুরুর মাধ্যমে শিক্ষা নিতে হয়। পিটিশন, কোর্টে মুভ, প্রেয়ার, কোর্টের প্রসিডিউর হাতেকলমে শিখতে হবে একজন সিনিয়র আইনজীবী থেকে। প্রথমেই নিজেরা প্র্যাকটিস না করে কোনো সিনিয়রের কাছ থেকে কাজ শিখুন।

ইত্তেফাক: আপনার সফলতার গল্প শুনতে চাই…

অ্যাটর্নি জেনারেল: একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা অত্যন্ত সাধারণ মানুষ আমি। সাবেক (প্রয়াত) অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাহেবের হাত ধরে আমার আইন পেশায় আসা। পরবর্তীতে (প্রয়াত) অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলামের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। উনাদের কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ। যখন আমি মাহবুবে আলম সাহেবের সঙ্গে কাজ করি তখন কম্পিউটার ছিল না। ম্যানুয়ালি টাইপ করতে হতো। একটা পিটিশন তৈরি করে আবার কারেকশন করতে অনেক সময় লাগত। যারা সিনিয়র ছিলেন তারা অনেক সহযোগিতা করতেন। আপনি যদি লক্ষ্য ঠিক রেখে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন তাহলে আপনার সফলতা আসবেই।

ইত্তেফাক: বার কাউন্সিলের পরীক্ষা নিয়মিত না হওয়ায় ইতিমধ্যে শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের জীবন থেকে বেশ কয়েক বছর চলে গেছে। তাদের বিষয়ে কি কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে?

অ্যাটর্নি জেনারেল: এখন প্রতি বছর আমরা একটা করে পরীক্ষা নেবোই। এটা নিশ্চিত থাকেন এবং যদি সম্ভব হয় আমরা দুইটা পরীক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করবো। বছরের প্রথম দিকে একটা, আর শেষের দিকে আরেকটা। এইভাবে অনেকটা সময় কাভার করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

সূত্র: ইত্তেফাক।

 

মতামত দিন