ঝরনা দেখতে গিয়েছিলেন একসঙ্গে, লাশ হয়ে ফিরলেনও একসঙ্গে!

চট্টগ্রাম: প্রতিদিনের পড়াশুনার চাপ থেকে থেকে ক্ষণিকের মুক্তি পেতে শুক্রবার ছুটির দিনে শিক্ষকদের সাথে ঝরনা দেখতে গিয়েছিল তরতাজা প্রাণগুলো। হয়তো যাওয়ার আগে মাকে বলে গিয়েছিল পছন্দের খাবার রাঁধতে। শিক্ষকদের হয়তো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ঝরনা দেখে ফিরে এসে পড়াশুনাতে আরও মন দেবে। তবে সব হয়তো, হয়তোই থেকে গেল। জীবনের সব হিসাবনিকাশ অকালেই চুকিয়ে একসঙ্গেই লাশ হয়ে ফিরলেন তরতাজা তরুণ প্রাণগুলো।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে একটি লেভেল ক্রসিংয়ে উঠে পড়া পর্যটকবাহী মাইক্রোবাসের সবাই ছিলেন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর আমানবাজারের আর অ্যান্ড জে প্রাইভেট কেয়ার নামের কোচিং সেন্টারের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী।

শুক্রবার সকালে শিক্ষক, ছাত্রসহ তারা ১৮ জন মাইক্রোবাসে করে খৈয়াছড়া ঝরনায় ঘুরতে গেছিলেন। ফেরার পথে শুক্রবার বেলা সোয়া ১টার দিকে মীরসরাইয়েয়ের বড়তাকিয়া রেলস্টেশন এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।

এক তুড়িতে সব সম্ভব করার বয়সটি পার করেছিলেন তারা। মা-বাবাকে ছেড়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে হঠাৎ করে বড় হয়ে যাওয়ার লাইসেন্স পাওয়ার বাঁধভাঙা আনন্দ ছিল তাদের চোখে। ছিল এক সময় সত্যি সত্যিই বিশ্বজয়ের আকাঙ্ক্ষা। সেই আনন্দই ধরা দেয় ঝরনা দেখতে যাওয়ার সময় কোচিং সেন্টারের সামনে তোলা একটি গ্রুপ ছবিতে।

তবে মুহূর্তের ভুলে থমকে যায় স্বপ্নবাজ সেই তরুণদলের জীবন। বিশ্বজয় করে মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানো আর হয়নি ওদের। হাজারো স্বপ্নের ইতি ঘটে ট্রেনের ধাক্কায়। সেই গাদাগাদি করে বাস মাইক্রোবাসের ভেতর শেষ মুহূর্তে বন্ধু আর শিক্ষকদের সঙ্গী করেই এক সঙ্গেই না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তারা।

শুক্রবার দুপুরে উপজেলার খৈয়াছড়া ঝরনা এলাকায় দুর্ঘটনার কবলে পড়া মাইক্রোবাসটিতে ছিলেন হাটহাজারীর কলেজছাত্র তানভীর হাসান হৃদয়। তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এখন। তবে এই দুর্ঘটনায় তার ১১ সহযাত্রীকে হারিয়েছেন।

হাসপাতালে তানভীর হাসান হৃদয় জানান, আমানবাজারের আর অ্যান্ড জে প্রাইভেট কেয়ার নামে কোচিং সেন্টারে তিনি পড়তেন। সেখান থেকে শুক্রবার সকালে শিক্ষক ও ছাত্রসহ তারা মাইক্রোবাসে করে খৈয়াছড়া ঝরনায় ঘুরতে গিয়েছিলেন।ফেরার পথে দুপুর সোয়া ১টার দিকে মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া রেলস্টেশন এলাকায় দুর্ঘটনার কবরে পড়েন তারা।

হৃদয় আরও বলেন, গাড়িতে চালকসহ আমরা ১৫ জন ছিলাম। তাদের মধ্যে আমাদের কোচিংয়ের শিক্ষক জিসান, রিদোয়ান, রাকিব ও সজিব স্যার ছিলেন। আমি গাড়িতে ঘুমিয়েছিলাম। দুর্ঘটনা কখন হয়েছে, কীভাবে হয়েছে কিছু মনে নেই। ঘটনার পর অজ্ঞান ছিলাম আমি।

মিরসরাই থানার এসআই সৈয়দ আহমেদ জানান, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে আসা মহানগর প্রভাতীর ধাক্কায় মাইক্রোবাসের ১১ যাত্রী নিহত হয়েছেন।

রেলওয়ে পুলিশের চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার হাসান চৌধুরী বলেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী মহানগর প্রভাতী ট্রেন ও মাইক্রোবাসের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ১১ জন নিহতের খবর শুনেছি।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, খৈয়াছড়া ঝরনা পর্যটনকেন্দ্র থেকে ফেরার পথে বড়তাকিয়া রেলস্টেশন এলাকায় ট্রেনটি ধাক্কা দেয়। মাইক্রোবাসে মোট ১৫ আরোহী ছিলেন। তাদের মধ্যে ১১ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তিনজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আর একজন সুস্থ আছেন।তিনি ট্রেন ধাক্কা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে মাটিতে পড়ে যান।

পূর্ব রেলের বিভাগীয় পরিবহণ কর্মকর্তা আনসার আলী বলেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী ওই লেভেল ক্রসিং পার হওয়ার মুখে খৈয়াছড়াগামী একটি পর্যটকবাহী মোইক্রোবাস লাইনে উঠে পড়ে। ধাক্কা লাগার পরই মাইক্রোবাসটি ট্রেনের ইঞ্জিনের সঙ্গে আটকে যায়, ওই অবস্থায় মাইক্রোবাসটিকে প্রায় ১ কিলোমিটার পথ ছেঁচড়ে নিয়ে থামে ট্রেন।

মতামত দিন