সিজার-উৎপলের ফেরা: বাকি অপহৃত-নিখোজদের পরিবারে নতুন আশা

নিউজ ডেস্ক: গত কয়েক মাসে ‘অপহৃত-নিখোঁজ’ ব্যক্তিদের সন্ধানের দাবিতে সভা-সেমিনার ও মানববন্ধন করেছেন স্বজনরা। কোনও কোনও নিখোঁজ ব্যক্তির শিশুসন্তানও গণমাধ্যমের সামনে আহাজারি করেছে। কিন্তু কোনও দিক থেকেই আশার কথা শুনতে পাননি এই স্বজনরা। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহরের মধ্যেই এবার নতুন প্রত্যাশা জেগে উঠেছে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে অপহৃত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুবাশ্বার হাসান সিজার ও তরুণ সাংবাদিক উৎপল দাসের ফিরে আসায় আপনজন ফিরে পাওয়ার নতুন স্বপ্নে বুক বাঁধছেন বাকি অপহৃতদের স্বজনরা। তারা বলছেন, শিগগিরই হয়তো বাড়ির দরোজায় কড়া নাড়বেন হারানো স্বজন। কয়েকজন অপহৃত ব্যক্তির স্বজনদের সঙ্গে আলোচনা করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

গত সাড়ে চার মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে রহস্যজনকভাবে ‘অপহৃত’ ও ‘নিখোঁজ’ হন ১৫ জন। এর মধ্যে দশ জন ফিরে এসেছেন। বাকি পাঁচ জনের এখনও সন্ধান মেলেনি। যারা ফিরে এসেছেন, তারা হলেন, ব্যাংক এশিয়ার এভিপি শামীম আহমেদ, বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী ও দলটির কেন্দ্রীয় নেতা অসিত ঘোষ অসিত, বেলারুশের অনারারি কনস্যুলার অনিরুদ্ধ কুমার রায়, দক্ষিণ বনশ্রীর নকিয়া-সিমেন্সের সাবেক প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান আসাদ, অ্যাভেনটিস-স্যানোফির ফার্মাসিস্ট জামাল রহমান, শাজাহানপুরের ফল ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন, গুলশানের প্রকাশক তানভীর ইয়াসিন করিম, সাংবাদিক উৎপল দাস ও মুবাশ্বার হাসান সিজার।

গত ১৮ নভেম্বর অনিরুদ্ধ কুমার রায়, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে (১৯ ডিসেম্বর) উৎপল দাস ও বৃহস্পতিবার (২১ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত মধ্যরাতে মুবাশ্বার হাসান সিজার ফিরে এসেছেন। তাদের ফিরে আসায় বাকি পাঁচ অপহৃদেতর স্বজনদের মনে আশার আলো জেগেছে। তারাও এখন অপেক্ষার প্রহর গুনছেন, শিগগিরই তাদের স্বজনরাও ফিরবেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের পরিবারের অপেক্ষা

গত ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বিমানবন্দর থেকে মেয়েকে আনতে গিয়ে নিখোঁজ হন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। তার গাড়িটিও সেখানে পাওয়া যায়। নিখোঁজ মারুফ জামান সর্বশেষ ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেছেন। এর আগে তিনি কাতারের রাষ্ট্রদূত ও যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সেলর হিসেবেও কাজ করেছেন। নিখোঁজ হওয়ার পরদিন মারুফ জামানের ব্যক্তিগত গাড়িটি খিলক্ষেত থানাধীন ৩০০ ফিট সড়ক থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ।

নিখোঁজ মারুফ জামানের মেয়ে সামিহা জামান বলেন, ‘বাবার সম্পর্কে কোনও আপডেট নেই। আমরা কোনও আপডেট পাচ্ছি না। আমি আসলে বুঝতে পারছি না, এত সময় কেন লাগছে? আমি শুধু আমার বাবাকে ফেরত চাই।’

মারুফ জামানের ছোট ভাই রিফাত জামান বলেন, ‘কোনও আপডেট নেই। পুলিশ তার অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানাতে পারেনি। কেউ কিছু বলছেও না। আমরা মারুফ জামানকে যেকোনও মূল্যে ফেরত চাই। আমরা তার ফিরে আসার অপেক্ষায় আছি।’

সৈয়দ সাদাত আহমেদের স্ত্রী-সন্তানের অপেক্ষা

২২ আগস্ট বিমানবন্দর সড়ক থেকে অপহৃত হন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও এবিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাদাত আহমেদ। অপহরণকারীরা কারণ ব্যবহৃত ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন নিয়েছে আর গাড়িটি রেখে গেছে। তারও কোনও খোঁজ মেলেনি চার মাসে। কোথায়, কিভাবে আছেন, তা কেউ জানেন না।

সাদাতের স্ত্রী লুনা সাদাত আহমেদ বলেন, ‘অফিসে যাওয়ার সময় তিনি অপহৃত হয়। এ সময় তার গাড়িতে একটি ল্যাপটপ এবং দুটি মোবাইল ফোন ছিল। সাদাত অপহৃত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দু’টি অ্যাপস (হোয়াটস আপস, ভাইবার) দু’দিন দীর্ঘ বিরতিতে খোলা ছিল। প্রথম খোলা পাওয়া যায়, গত ২৪ আগস্ট ও দ্বিতীয়বার খোলা পাওয়া যায় ১১ সেপ্টেম্বর। এই সাড়ে তিন মাসে আর খোলা পাওয়া যায়নি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, সবার মতো আমার স্বামীও দ্রুত ফিরে আসবেন। আমার সন্তান তার বাবাকে ডাকতে পারবে। বাবার স্নেহ পাবে।’

সন্তানের অপেক্ষায় ইশরাক আহমেদের বাবা

২৫ আগস্ট ধানমন্ডির স্টার কাবাবের সামনে থেকে নিখোঁজ হন কানাডার ‘ম্যাকগিল’ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইশরাক আহমেদ (২০)। তিনি ঢাকায় ছুটিতে এসেছিলেন। এ নিখোঁজ ছাত্রের বাবা তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী জামালউদ্দিন আহমেদ ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন।

ইশারকের নিখোঁজের বিষয়ে ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ বলেন, ‘আমরা এখনও কোনও তথ্য পাইনি। আমারা চেষ্টা করছি, অগ্রগতি হলে জানাবো।’

কল্যাণ পার্টির মহাসচিবের অপেক্ষায় পরিবার

ইশরাকের একদিন পর কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম. এম আমিনুর রহমান নিখোঁজ হন। গত ২৭ আগস্ট রাত ১০টার দিকে নয়াপল্টন থেকে সাভারের আমিনবাজারে পল্লীবিদ্যুৎ অফিসের পাশে বাসার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তিনি। এরপর আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। তার পরিবারের সঙ্গে কেউ যোগাযোগও করেনি। তার পরিবারও তার জন্য অপেক্ষা করছেন।

বাবার জন্য মেয়ের আর্তনাদ

গত ১৭ ডিসেম্বর বিকাল ৩টার দিকে ধানমন্ডির ৯/এ ইবনে সিনার সামনে থেকে লন্ড্রি ব্যবসায়ী সিরাজুল হক মিন্টু অপহৃত হন। এ সময় তার সঙ্গে আজাদ নামে একজন বন্ধু ছিলেন। পুরো বিষয়টি তার সামনেই ঘটেছে। তার কাছ থেকে পরবর্তী সময়ে মিন্টুর শ্যালক নিয়াজ মোহাম্মদ সবকিছু জানতে পেরেছেন। ঘটনার পর থেকে এই ব্যবসায়ীর একমাত্র সন্তান রাইয়ান হক পৃথ্বি কান্নাকাটি করছেন। অপহৃত মিন্টুর স্ত্রী এ বছরের নভেম্বরে মারা যান। বাবার সঙ্গেই থাকতেন পৃথ্বি। বাবা না থাকায় এখন মামাদের সঙ্গে থাকছেন। বাবার কথা ভেবে প্রায়ই সে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

পৃথ্বির মামা নিয়াজ বলেন, ‘মেয়েটা আমাদের সঙ্গে থাকছে। ওর পরিবারের আর কেউ অবশিষ্ট নেই। মা মারা গেছেন, বাবাকেও অপহরণ করা হয়েছে। মেয়েটা প্রায়ই কান্নাকাটি করে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা টিভিতে দেখেছি সাংবাদিক উৎপল ও শিক্ষক মুবাশ্বার ফিরে এসেছেন। আমরাও সবার মতো আশা করছি, আমাদের মিন্টু ভাইও ফিরে আসবেন তার মেয়ের কাছে।’সুত্র: বাংলা ট্রিবিউন।

মতামত দিন