রহস্যে ঘেরা থাকছে অপহরণকারীরা!

 

দেশে বিভিন্ন সময় নিখোঁজ হয়েছেন অনেক ব্যক্তি। এদের মধ্যে সম্প্রতি কয়েকজন ফিরেও এসেছেন। এতে স্বস্তি ফিরেছে ওইসব পরিবারের স্বজনদের বুকে। কিন্তুযারা এখনও ফেরেনি তারা কি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন। এ নিয়ে নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের উৎকন্ঠার শেষ নেই।

নিখোঁজ থাকার পর যারা ফিরেছেন তাদের কাছেও মিলছে না কোনো তথ্য। অপরহরণকারীদের ব্যাপারে তেমনভাবে মুখও খুলছেন না তারা। ফলে কারা তাদের অপহরণ করেছিলেন, নিখোঁজের দিনগুলোতে তারা কোথায় ছিলেন, কেনই বা আটকের পর আবার ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে এমন সব প্রশ্নের কোনো উত্তর মিলছে না। সংগত কারণে রহস্যেঘেরা থাকছে অপহরণকারীদের তুলে নেওয়া ও ফিরিয়ে দেওয়ার তথ্য।

ফিরে আসা ব্যক্তিদের কাছে তেমন কোনো তথ্য না মেলার কারণ হিসেবে মানবাধিকার কর্মী এবং অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, তারা আটককালীন সময়ে ভীতিকর অবস্থায় ছিলেন। এ কারণে তারা আর মুখ খুলছেন না বা তাদের মুখ খুলতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে এসব গুম বা অপহরণ প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞরা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সবাইকে পরামর্শ দিয়েছেন।

অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের কোথায় রাখা হয়েছিল, কীভাবে ওই স্থানে নিয়ে যাওয়া হলো এবং কীভাবে আবার ফিরে আসা হলো তা তারা বর্ণনা করেছেন। তবে তা খুব বেশি স্পষ্ট নয়। এ কারণে ওইসব স্থান ঢাকার বাইরে নাকি ভেতরে তাও বোঝা মুশকিল বলে মনে করেন তারা।

ফিরে আসাদের দেওয়া কিছু তথ্যে বেশ কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। অধিকাংশই জানিয়েছেন, তাদের তুলে নেওয়ার পর কোন একটি প্রকোষ্ঠে রাখা হয়েছিল। সেখানে দেওয়া হয়েছিল প্রস্তুতকৃত খাদ্য। কারও চোখ বেঁধে আবার কারও হাত বেঁধে রাখা হতো। এদের কারও কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই চাঁদা নেওয়ার জন্য কোনো তৎপরতা দেখাননি অপহরণকারীরা। এমনকি নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজনরা অপহরণকারীদের কাছ থেকে কোনো ফোনও পাননি।

তারা আরও জানিয়েছেন, অপহরণকারীরা তাদের ব্যক্তিগত বিষয়, পেশা ও বিভিন্ন প্রশ্ন করত। প্রত্যেককে একটি বদ্ধ করে তালা দিয়ে রাখা হতো। প্রতিদিন খাবারও দেওয়া হতো তাদের। কিন্তু কারা সেই ব্যক্তি তা দেখতে পায়নি ফিরে আসাদের কেউই। ফিরে আসা এসব ব্যক্তিকে কেন অপহরণ করা হয়েছিল আর আটকে রেখে কী জানতে চাওয়া হয়েছিল তাও অজানা। এ ছাড়াও এসব ব্যক্তিকে আটক রাখার সময়ে কোন ধরনের শারীরিক অত্যাচার ও মানসিক নির্যাতন করা হয়নি। তাহলে কেন তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আর কেনই বা এতোদিন আটকে রাখা হলো? এসব নানা প্রশ্ন এখন সামনে চলে আসে।

দুই মাসেরও অধিক সময় নিখোঁজ থাকার পর ফিরে আসা সাংবাদিক উৎপল দাস। ছবি: সংগৃহীত। 

ফিরে আসা ব্যক্তিরা নিখোঁজকালীন সময়গুলো এমন একটা ভয়াবহ অবস্থার মধ্যদিয়ে অতিবাহিত করেছেন যার অভিজ্ঞতাটা প্রতিনিয়ত তাদের মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এই ভীতিকর পরিস্থিতির কারণেই ফিরে আসা ব্যক্তিরা কোন ধরনের মুখে খুলছেন না বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান।

তিনি বলেন, ‘যারা ভিকটিম তাদের পক্ষে বক্তব্য দেওয়াটা কঠিনই বলে তারা পারছে না। প্রতিনিয়ত এমন ঘটনার মধ্যদিয়ে দৃশ্যত মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, এই ধরনের ঘটনার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত তারা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর চেয়ে কোনো অংশেই কম সামর্থ রাখে না। তারা যথেষ্ট সুশৃঙ্খল এবং নিরাপদ আস্তানা গড়েছেন। যেখানে মানুষকে নিয়ে আটকিয়ে রাখা যায় এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীও তাদের স্পর্শ করতে পারে না। অর্থ্যাৎ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে তারা এমন আস্তানা গড়ে তুলেছে যে আস্তানাগুলো এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো চিহিৃত করতে সক্ষ্যম হয়নি বা অভিযান চালাতে পারেনি।’ এই গোষ্ঠীর সদস্যরা প্রত্যেককে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ। এমনকি রাষ্ট্রীয় বাহিনীও তাদের স্পর্শ করতে পারে না মনে করেন এই মানবাধিকার কর্মী।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, সহজ বিষয় তাদের ওপর কোন ধরনের প্রেসার আছে। এ কারণে তারা ফিরে আসার পর মুখ খুলছেন না। তা ছাড়াও তারা অপহরণের শিকার হয়েছিলেন মানেই হলো একটি ট্রমার মধ্যে অবস্থান করছেন। যারা অপহরণের শিকার হচ্ছেন তাদের খুঁজে বের করতে গণমাধ্যমও তেমন দায় নিয়ে কোন অনুসন্ধ্যানমূলক প্রতিবেদন করছে না। কেউ নিখোঁজ হলে তাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্রও সেটা করছে না।

অন্যদিকে কারা এসব কাণ্ড ঘটাচ্ছে তার জন্য জবাবদিহি মনোভাব নিয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীতেও তদন্তের আগ্রহ নেই। ফলে এসব ঘটনা প্রতিরোধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার বলে মনে করছেন তিনি।

গত ১৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে ফিরেছেন সাংবাাদিক উৎপল দাস। তাকে সেদিন একটি মাইক্রোবাসে করে নারায়নগঞ্জের ভুলতা এলাকার একটি তেল পাম্পের সামনে নামিয়ে দিয়ে যায় অপহরণকারীরা।

সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার মায়ের সঙ্গে অভিমান করে চলে গিয়েছিলাম। নেটওয়ার্ক এর বাইরে ছিলাম তাই কোনো যোগাযোগ করতে পারিনি।’ অপহরণকারীরা তার কাছে চাঁদার টাকা চেয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। কিন্তু চাঁদার ব্যাপারে অপরহণকারীরা তার পরিবারকে কোন ধরনের ফোন দেয়নি বলে জানা গেছে। গত ১০ অক্টোবর মতিঝিলে উৎপলের পত্রিকা অফিস থেকে ফেরার পথে নিখোঁজ হন তিনি। পরে তার পরিবার ও অফিসের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় দুটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়।

এর আগে আড়াই মাস পর বাড়ি ফিরে আসেন ব্যবসায়ী ও বেলারুশের অনারারী কনসাল অনিরুদ্ধ রায়। তবে তিনি ফিরে এসে অপহরণকারীরা তার কাছে টাকা চেয়েছিল এমন কিছু বলেননি। তার বাড়ি ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও তিনি এতোদিন কোথায় ছিলেন এবং কারা তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল সে বিষয়ে কিছুই জানাতে পারেননি।

দুই মাস ১৯ দিন নিখোঁজের পর ফিরে আসা ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ রায়। ছবি: সংগৃহীত। 

তবে ফিরে আসার পর একটি গণমাধ্যমকে অনিরুদ্ধ জানিয়েছিলেন, তাকে একটি বদ্ধ কক্ষ রাখা হয়েছিল এবং নিয়মিত ট্রেতে করে খাবার দিয়ে যাওয়া হতো। রুমটি ছিল অন্ধকারাচ্ছ। ওই রুম থেকে বাহিরের কোন আলো তিনি দেখতে পেতেন না। সব মিলে তাকে তুলে নিয়ে ওই রুমে রাখার বিষয়টি পরিকল্পিত ছিল বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। গত ২৭ আগষ্ট গুলশান-১ এলাকা থেকে নিখোঁজ হন অনিরুদ্ধ। নিখোঁজের ৭৯ দিন পর তিনি ফিরে আসেন।

সর্বশেষ ২২ ডিসেম্বর রাত দেড়টার দিকে ফিরে আসেন নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোবাশ্বার হাসান সিজার। তাকে রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকায় একটি মাইক্রোবাসে করে নামিয়ে দিয়ে যায় অপহরণকারীরা। তিনি বাসায় ফিরে নিখোঁজ থাকার দিনগুলোর কিছুটা বর্ননা দিয়েছেন। কিন্তু অপহরণকারীদের ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছুই বলতে পারেননি। এমনকি অপহরণকারীদের কাউকেই তিনি চোখে দেখেননি বলে জানান।

নামিয়ে দেয়ার সময় সিজারকে বলা হয়েছিল, ‘পালায় যা গা, পিছনে তাকাইলে মাইরা ফেলামু।’ অপহরণকারীরা তার কাছে বেশ কয়েক দফা টাকাও দাবি করেছিল বলে জানায় সিজার। এ জন্য তার কাছে পরিবারের লোকজনের ফোন নাম্বার নিয়ে কল করা হয়েছিল। কিন্তু অপহরণকারীদের কাছ থেকে এমন কোন ফোন তার পরিবার পায়নি বলে জানিয়েছে সিজারের বোন তামান্না তাসনিম।

গত ৭ নভেম্বর রোকেয়া স্মরণী থেকে ফেরার পথে তাকে কয়েকজন ব্যক্তি একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তার পরিবারের পক্ষ থেকে ওইদিন রাতেই খিলগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন।

সর্বশেষ নিখোঁজ সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। ছবি: সংগৃহীত। 

সর্বশেষ গত ৪ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। সেদিন তিনি বিদেশ ফেরত মেয়েকে বিমানবন্দর থেকে আনতে গিয়ে নিখোঁজ হন। পরদিন তার ব্যবহৃত গাড়িটি খিলক্ষেত এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। ওইদিন ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে তার পরিবার। কিন্তু এখনো তার কোন সন্ধ্যান মেলেনি।

গত চার মাসে ঢাকা থেকে ১২ জন ব্যক্তি নিখোঁজ হয়েছেন। এই তালিকায় নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান, ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ রায়, আইএফআইসি ব্যাংকের কর্মকর্তা শামীম আহমেদ ও সাংবাদিক উৎপল দাস নিখোঁজ থাকলেও তারা ফিরে এসেছেন। তবে পুস্তক প্রকাশক তানভীর ইয়াসিন করিম, কল্যাণ পার্টির মহাসচিব আমিনুর রহমান ও বাকিরা ফিরে আসেনি। এর মধ্যে আবার দুই বিজেপি নেতাকে পরে গ্রেফতার দেখানো হয়।

হংকং ভিত্তিক এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন (এএইচআরসি) ও দেশীয় মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট বছর নয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৩৯৫ জন নিখোঁজ হয়েছেন। পরবর্তী ৫২ জনের লাশ মিলেছে। আর ফিরেছেন ১৯৭ জন। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১৪৬ জন।

তবে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজের সংখ্যা আরও বেশি।

সূত্র: প্রিয়.কম

মতামত দিন