শত বাধায়ও সফল বাংলাদেশের অধিনায়ক মারিয়া মান্ডা

ক্রীড়া ডেস্ক: বাবার কোনো অস্তিত্ব নেই মারিয়া মান্ডার স্মৃতিভাণ্ডারে। কোনোকিছু চেনা, বোঝার আগেই সবকিছুর ঊর্ধ্বে চলে গেছেন বাবা বীরেন্দ্র মারাক। বাবা দুনিয়া ছাড়ার পর গৃহপরিচারিকার কাজ নেন মা এনাতো মান্ডা। মায়ের উপার্জনে সংসার চালানো কঠিন বলে বোন পাপিয়া মান্ডাও একই কাজ শুরু করেন। বর্তমানে অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করেন এনাতো মান্ডা। হতদরিদ্র ওই পরিবারে বেড়ে ওঠা মারিয়ার হাতেই আজ উঠল দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের স্মারক।

ছয় বছর আগে বঙ্গমাতা স্কুল ফুটবল দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিণত হয়েছেন তিনি। সে সিঁড়ি বেয়ে এখন তিনি অনূর্ধ্ব-১৫ দলের অধিনায়ক। এ দায়িত্বটা কেবল বাহুবন্ধনীতেই আবদ্ধ নয়। কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটনের কথায়, ‘মাঠ ও বাইরে— দুই জায়গায় ঠাণ্ডা, পরিণত মারিয়া।’

এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপ ও এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ মূল পর্বে দলের সহঅধিনায়ক ছিলেন এ মিডফিল্ডার। নেতৃত্বটা কেবল দলকে সুশৃঙ্খল রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মাঝমাঠ থেকে খেলা গড়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কখনো রক্ষণ দুর্গ আগলান আবার কখনো উঠে আসেন আক্রমণে। মাঝমাঠ থেকে রক্ষণ চেরা পাস দিতেও তার জুড়ি নেই। তার যোগ্য নেতৃত্বে চার ম্যাচে শতভাগ জয়ে অপরাজিত থেকেই শিরোপা জিতল বাংলাদেশ। আসরে ১৩ গোল করা বাংলাদেশ কোনো গোল হজম করেনি।

এ সাফল্যের পর মারিয়া বলেছেন, ‘প্রয়াত একসময়ের সতীর্থ সাবিনা ইয়াসমিন, দেশের ১৬ কোটি জনগণ ও প্রধানমন্ত্রীকে এ শিরোপা উত্সর্গ করছি।’ যোগ করেন, ‘অকালে আমাদের ছেড়ে না গেলে সাবিনা হয়তো আজ আমাদের সঙ্গেই খেলত, উল্লাস করত।’

এ মিডফিল্ডার নিজেকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান, হাল ধরতে চান অভাবকে সঙ্গী করে চলা সংসারের। তার কথায়, ‘বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) অথবা অন্য কোনো উত্স থেকে যে অর্থ পাই, তা আমি মায়ের হাতে তুলে দিই। এখন নিজেকে আরো বড় ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে আরো অর্থ উপার্জন করতে চাই।’

বাংলাদেশ আনসারে ক্রীড়া দলের সদস্য হিসেবে মাসে ৫ হাজার টাকা ভাতা পান মারিয়া। জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকলে বাফুফে থেকে ১০ হাজার টাকা করে পান।

২০১১ সালে বঙ্গমাতা স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতা দিয়ে পথচলা শুরু মারিয়ার। নিজের শুরুর সময়টা সম্পর্কে এ মিডফিল্ডার বলেছেন, ‘প্রথম প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলতে হয়েছে খালি পায়ে। বুট কেনার সামর্থ্য ছিল না বলেই খালি পায়ে খেলতে হয়েছে। ওই ম্যাচেই ফুটবলের প্রেমে মজে যাই। সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা করি। তার পরই স্থানীয় কোচ এবং বাফুফের সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।’

মারিয়াদের সাফল্য সম্পর্কে কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটন বলেছেন, ‘আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল— প্রতি ম্যাচে জয় এবং শিরোপা নিশ্চিত করা। মেয়েরা সে লক্ষ্য পূরণ করেছে।’ রক্ষণে দুর্দান্ত খেলা আঁখি খাতুন প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়ার পর বলেছেন, ‘আমি সেরা খেলোয়াড় হয়েছি, এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, ওটাই তৃপ্তির বিষয়।’

গতকাল ব্যবধান নির্ধারণী গোলটি ছিল শামসুন্নাহারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সপ্তম। ম্যাচের পর এ ফরোয়ার্ড বলেছেন, ‘লেফট-উইং থেকে আক্রমণভাগে খেলানোর পর কোচ অন্যদের চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন— শামসুন্নাহার নিজের নৈপুণ্য দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করবে। আমার গোলে শিরোপা নিশ্চিত হয়েছে— এতে আমি গর্বিত।’

মাঠে অধিনায়ক মারিয়ার খেলার ধরনটা পাক্কা রাঁধুনির মতো। তাকে কিছুটা মেলানো যায় স্পেন ও বার্সেলোনার মিডফিল্ডার সার্জিও বুসকেটসের সঙ্গে। পা থেকে বল কেড়ে নিতে হবে, সেখানে মারিয়া। আবার মাঝমাঠে বল দখলে রাখতে হবে, সেখানেও আছে খর্বাকৃতির মেয়েটি। বল পায়ে নাও, প্রয়োজন হলে হোল্ড কর, সুযোগ হলে দ্রুত উইংয়ে ভালো একটি পাস দাও। এক কথায় সাধারণ ফুটবল। কিন্তু কজনই-বা পারে এভাবে খেলতে? মারিয়া মান্ডা এত সহজভাবে দারুণ খেলতে পারে বলেই নাকি তাকে অধিনায়ক হিসেবে বেছে নিয়েছেন বাংলাদেশ কোচ গোলাম রব্বানি, ‘মারিয়া সিনিয়র ও বয়সভিত্তিক সব দলেরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। পায়ে বল রাখার ক্ষমতা ভালো। যেকোনো পরিস্থিতিতেই ভালো পাস দিতে পারে। মাঠের বাইরেও দারুণ ঠান্ডা মেজাজের, কোনো ঝামেলায় নেই।’

সতীর্থ সবাই মজে থাকে বাড়ির ছোট মেয়ে মারিয়ার গুণে। দরিদ্র ঘরে জন্ম, পরিবারের জন্য গৃহপরিচারিকার কাজে সহযোগিতা, তবুও সুশিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়নি মারিয়া। কত বাধা পেরিয়ে এখন বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক। চ্যাম্পিয়নদের গল্পটা বুঝি এভাবেই লেখা হয়।

মতামত দিন