শূন্যরেখা থেকে সরেছে মিয়ানমার সেনারা

তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে সরেছে মিয়ানমার সেনারা। তবে মাঝেমধ্যে তাদের কাঁটাতারের বেড়ায় পাশে দাঁড়িয়ে অথবা হেঁটে টহল দিতে দেখা গেছে। বিজিবি বলছে, এটা তাদের নিয়মিত টহলের অংশ। তারা সীমান্তে তৈরি কাঁটাতারের বেড়া সংস্কার করছে।

বিজিবি ও শূন্যরেখার আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গারা জানায়, আজ শনিবার সকাল ছয়টা থেকে শূন্যরেখার আগের জায়গায় অবস্থানরত সেনাসদস্যদের দেখা যায়নি। শুক্রবার গভীর রাতে সেনাসদস্যদের পেছনে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গত দুই দিন সেনাসদস্যদের কাঁটাতারের বেড়ার পাশে তৈরি সড়কের ওপর এবং পাহাড়ি চৌকিতে ভারী অস্ত্র নিয়ে পাহারা দিতে দেখা গিয়েছিল। তবে সেনাদের চৌকিগুলো আগের অবস্থায় রয়ে গেছে।

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয়শিবিরটির অবস্থান। গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সেই আশ্রয়শিবিরের পেছনে (মিয়ানমার সীমান্তে) সেনাসমাবেশ ঘটায় মিয়ানমার। ভারী অস্ত্র নিয়ে কয়েক শ সেনাসদস্য সেখানে মহড়া ও টহল দেয়। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

সীমান্তে দায়িত্বরত বিজিবির কয়েকজন সদস্য বলেন, গতকাল শুক্রবার বিকেলে ঘুমধুম সীমান্তে বিজিপির সঙ্গে বিজিবির পতাকা বৈঠকের পর মিয়ানমার কিছুটা নমনীয় হয়েছে। বিজিবির কড়া প্রতিবাদের মুখে তারা সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে সেনাসদস্যদের সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে মাঝেশধ্যে সেনা ও বিজিপি সদস্যরা কাঁটাতারের বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে এ পাড়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে।

শূন্যরেখার অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গা নেতা ( মাঝি) দিল মোহাম্মদ বলেন, সকাল থেকে সেনাসদস্যরা পেছনের দিকে সরে গেছে। তবে বেলা আড়াইটার দিকে দুটি পিকআপ ভ্যানে করে ৫০ থেকে ৬০ জন সেনাসদস্য কাঁটাতারের বেড়ার কাছে নেমে টহল শুরু করে।

আজ সকালে মাত্র একবার শূন্যরেখা থেকে রোহিঙ্গাদের চলে যাওয়ার জন্য মাইকিং করেছিল মিয়ানমার। বেলা তিনটা পর্যন্ত এ রকম আর কোনো ঘোষণা দেয়নি।

শূন্যরেখা থেকে মিয়ানমার সেনাসদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মঞ্জুরুল হাসান খান বলেন, এই মুহূর্তে সেখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। তারপরও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে।

আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা মো. আরিফ বলেন, গতকাল গুলিবর্ষণের ঘটনা না ঘটলেও রাতে মিয়ানমার সীমান্তের পাহাড় থেকে আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা বসতিতে প্রচুর ইটপাটকেল ছোড়া হয়েছে। যেকোনো উত্তেজনা সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়শিবির থেকে উচ্ছেদের চক্রান্ত করছে মিয়ানমার। এই আশ্রয়শিবিরে ছয় মাস ধরে অবস্থান করছে ১ হাজার ৩২১ পরিবারের ৬ হাজার ২২ জন রোহিঙ্গা। আশ্রয়কেন্দ্রের পেছনে মাত্র আধা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে রোহিঙ্গাদের ১২টি গ্রাম। এখান থেকেই রোহিঙ্গারা নিজদের জন্মভূমির ১২ গ্রামে ফিরতে চায়। কিন্তু সেখানে গ্রামের কোনো চিহ্ন রাখেনি মিয়ানমার।

সকালে সরেজমিন দেখা গেছে, পাথরকাটা নামক ছোট খালের ওপারে শূন্যরেখার আশ্রয়শিবিরটি দাঁড়িয়ে আছে। শিবিরের পেছনে লাগোয়া মিয়ানমারের কাঁটাতারের বেড়া। তুমব্রু সীমান্তে জলপাইতলী থেকে পূর্বদিকে কোনারপাড়া পর্যন্ত অন্তত সাত কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়ার গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে অস্ত্রধারী অল্পসংখ্যক সেনা ও বিজিপি। তাদের উপস্থিতিতে কাঁটাতারের বেড়ার সংস্কারকাজ করছে লোকজন।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম সরওয়ার কামাল বলেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সীমান্তের শূন্যরেখায় সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছিল মিয়ানমার। উদ্দেশ্য, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধ ও সীমান্তে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা।

গত বছরের ২৫ আগস্টের পর থেকে রাখাইন রাজ্য থেকে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে পালিয়ে আসেন ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। এর আগে আসেন আরও চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা। ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মধ্যে ইতিমধ্যে ১০ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন হয়েছে।

মতামত দিন