অবশেষে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের পথে বাংলাদেশ

সব শর্ত পূরণ করে অবশেষে নিম্ন-আয়ের দেশের তালিকা থেকে নাম কেটে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লেখাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের দেওয়া নির্ধারিত তিন শর্ত পূরণ করায় চলতি মাসেই বাংলাদেশ এই স্বীকৃতি পাচ্ছে। এ উপলক্ষে আগামী ২০ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত দেশব্যাপী এক সপ্তাহের উৎসব পালন করবে প্রশাসন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের স্বাক্ষর করা এক আদেশের মাধ্যমে সরকারের সব বিভাগের সচিব বরাবর লেখা চিঠিতে এ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওই আদেশে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার তাগিদ দেওয়া হয়।

জানা গেছে, বাংলাদেশকে এই সম্মানের স্থানে নিয়ে যাওয়ার কারিগর হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ২২ মার্চ এই সম্বর্ধনা দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। এ উপলক্ষে প্রস্তুতিও চলছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরস্থ বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান অনিুষ্ঠিত হতে পারে।

এদিকে গত ২২ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জাতিসংঘের তালিকায় প্রবেশের প্রক্রিয়া শুরু উপলক্ষে আগামী ২২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। ওইদিন থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সপ্তাহব্যাপী আনন্দ র‌্যালি পালন করবে সরকার। ওইদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা জানাতে ওইদিন আনন্দ র‌্যালি বের হবে। এছাড়া সপ্তাহব্যাপী সারাদেশে আনন্দ র‌্যালি অনুষ্ঠিত হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বিভিন্ন রকম ডিসপ্লে করবে। ওইদিন রাজধানীতে ভিড় হতে পারে। সেজন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর থাকবে।’

উল্লেখ্য, উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশের জন্য আগামী ২২ মার্চ জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানানো হবে।

এ উপলক্ষে যে সব কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- অনুষ্ঠানকে নান্দনিক, আকর্ষণীয় ও সাড়ম্বর করতে এবং বিশেষ সেবা সপ্তাহ পালন উপলক্ষে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের উদ্যোগে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে নাগরিক সুবিধাগুলো জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে দৃশ্যমান সেবাদান ও মান নিশ্চিত করা হবে। দেশের প্রতিটি বিভাগে বিভাগীয় কমিশনার, প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসক, প্রতিটি উপজেলায় ইউএনওর উদ্যোগে আলোচনা, সেমিনার, চিত্র প্রদর্শনী, ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা, আনন্দ শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হবে। তাছাড়া এলাকাভিত্তিক নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা, ফুটবল, কাবাডি, ক্রিকেটসহ জনপ্রিয় খেলার প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ উপলক্ষে তথ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায়, প্রিন্ট মিডিয়ায় গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠান, তথ্যধর্মী লেখা আহবান, সম্পাদকীয় লেখা প্রকাশ, টিভি, রেডিওতে টিভিসি, থিম সং প্রচারসহ টক শো’র আয়োজন করা হবে।

কর্মসূচির আওতায় তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উন্নয়ন প্রদর্শনী করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে টিভিসি ও থিম সং প্রচারের ব্যবস্থা করবে স্থানীয় সরকার বিভাগ। বাস, গাড়িতে উন্নয়ন ও উত্তরণ সংক্রান্ত স্টিাকারের মাধ্যমে প্রচার করবে সড়ক বিভাগ। এছাড়াও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় দেশব্যাপী পালাগান, জারি গান ও লোকজ সাংস্কৃতি প্রচার করার কথা বলা হয়েছে ওই নির্দেশনায়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘ জাতিসংঘের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করায় চলতি মাসেই নিম্ন-আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি পাচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের দেওয়া এমন স্বীকৃতি স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম সাফল্য। তাই সরকার দেশের এই সাফল্য ও অর্জনকে উদযাপনে ২০ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত দেশব্যাপী উৎসব পালন করবে।’

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, “ ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘে নিম্ন-আয়ের দেশ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত হয়। সেসময় একই শ্রেণির সদস্য দেশ ২৫টি থাকলেও বর্তমানে বিশ্বে নিম্ন-আয়ের দেশ রয়েছে ৪৭টি। এর মধ্যে বাতসোয়ানা ১৯৯৪ সালে, কেপভার্দ ২০০৭ সালে, মালদ্বীপ ২০১১ সালে, সামোয়া ২০১৪ সালে ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনি ২০১৭ সালে স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশ থেকে উত্তরণের সক্ষমতা অর্জন করে। ২০১৮ সালে নিম্ন-আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের সুপারিশ পাওয়া তিনটি দেশের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশই জাতিসংঘের নির্ধারিত লক্ষমাত্রা (নির্ণায়ক) তিনটিতেই সাফল্য অর্জন করেছে।

উল্লেখ্য, এলডিসি থেকে উত্তোরণে তিনটি নির্ণায়কের যে কোনো দু’টির উত্তরণ মান অর্জন করলে অথবা মাথাপিছু জিএনআই উত্তরণ মানের দ্বিগুণ হলেই এই স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘ।

তবে এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের নির্ধারিত তিনটি শর্তই বাংলাদেশ অর্জন করেছে। জাতিসংঘের নির্ধারিত মান ২০১৮ সালে মাথাপিছু আয় এক হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার থাকার কথা বলা হলেও ‘জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)-র দেওয়া হিসাব অনুসারে এই সূচকে বাংলাদেশের অর্জন এক হাজার ২৭২ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-’র হিসেবে যা এক হাজার ২৭১ মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় শর্তে মানব সম্পদ বিষয়ক সূচকে জাতিসংঘের নির্ধারিত মান ৬৬ বা তার বেশি হওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশর অর্জন সিডিপির হিসেবে ৭২ দশমিক আট ভাগ এবং বিবিএস এর হিসেবে ৭২ দশমিক নয় ভাগ। জাতিসংঘের নির্ধারিত তৃতীয় শর্তে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে উত্তরণের মান ৩২ বা তার কম নির্ধারিত থাকলেও সিডিপির হিসেবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন ২৫ এবং বিবিএস এর হিসেবে ২৪ দশমিক আট ভাগ।

মতামত দিন